issue_cover
x
Featurelist detail

z টিন! টিনের গল্প
দিলীপকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়

না, টিনটিনের গল্প নয়, টিনের গল্প। টিন ধাতুর গল্প। তবে তাতে ক্ষতি নেই, টিনটিনের গল্পের মতোই রোমাঞ্চকর এই টিনের গল্প। একটা উলটোপালটা প্রশ্ন করি। ১৮১১ সালে রাশিয়া জয় করতে গিয়ে ফরাসী সম্রাট নেপোলিয়ান বোনাপার্টি কেন হেরে গিয়েছিলেন, জান কি? উত্তরে বলতে হয়, বিশ্ববিজয়ী সম্রাটের এই বিপর্যয়ের মূলেও টিনটিনের মতোই খামখেয়ালি স্বভাবের এই টিনের কিছু ভূমিকা ছিল। নেপোলিয়ানের সৈন্যদের পরনে ছিল ভারী গরম কোট, পায়ে ইয়া বুট। রাশিয়ার হাড়-কাঁপানো ঠান্ডার সঙ্গে পাঞ্জা লড়বার জন্য সরঞ্জামের অভাব ছিল না। কিন্তু ঘাটতি ছিল এক জায়গায়। সৈন্যদের গরম কোটের বোতাম ছিল টিনের তৈরি, যে টিন ১৩ ডিগ্রী সেনটিগ্রেড তাপমাত্রার নীচে রাসায়নিক পরিবর্তনের ফলে ‘ধূসর টিনে’ (গ্রে টিন) রূপান্তরিত হয়। এই ‘ধূসর টিন’ মুচমুচে বিস্কুটের মতোই ভঙ্গুর। ফলে রাশিয়ার প্রচণ্ড শীতে (যা শীতকালে হিমাংকের অনেক নীচে চলে যায়) নেপোলিয়ানের সৈন্যদের কোটের বোতাম ভেঙে চূরচূর। তারপর ঐ হিমঠান্ডায় ব্রংকাইটিস হয়ে মারা গেল প্রায় আদ্ধেক সৈন্য, বাকি যারা প্রাণে বাঁচল, তাদেরও আর যুদ্ধ করবার উৎসাহ বা শক্তি কিছুই অবশিষ্ট ছিল না। কোনরকমে পালিয়ে সে যাত্রা প্রাণে বাঁচল তারা। নেপোলায়ান সেবার যুদ্ধে হারলেন রসায়ন শাস্ত্রের এই সরল সত্যটির হদিশ রাখতেন না বলে।
যে টিনের খামখেয়ালিপনার জন্য নেপোলিয়ানের যুদ্ধে এমন পরাভব, তার প্রকৃতি কিন্তু এমনিতে খুব নমনীয়। একে পিটিয়ে ছাতু করে খুব পাতলা পরতে পরিণত করা অসম্ভব নয়। ভাঙা বাসনপত্র বা ধাতুর তৈরি খেলনাপত্র জুড়তে ঝালাইয়ের কাজে লাগলেও টিনের মূল ব্যবহার কিন্তু টিন প্লেট তৈরিতে। ইসপাতের পাতলা চাদরের ওপর তরল টিনের প্রলেপ লাগিয়ে তৈরী হয় টিন প্লেট। এই টিন প্লেটেই সারা পৃথিবীতে তৈরী হচ্ছে লাখো-লাখো টিনের কৌটো, যা আজ প্যাকিং শিল্পের মূল বুনিয়াদ। ওষুধপত্র থেকে শুরু করে রসগোল্লা প্যাকিংএ পর্যন্ত টিনের কৌটো লাগে। শিল্পী রঁদা বা হেনরি মূরের ভাস্কর্যের উপাদান যে ব্রোঞ্জ, তা প্রস্তুত করতে তামার সঙ্গে মিশেল দিতে হয় টিন। এই ব্রোঞ্জ তৈরির ইতিহাস ঘাঁটলে আমাদের চলে যাতে হবে ৩৭০০ খ্রীস্টপূর্বাব্দে। তৎকালীন মিশরের একটি ব্রোঞ্জের রড পরীক্ষা করে শতকরা প্রায় ৯ ভাগের মতো টিন পাওয়া গেছে। অর্থাৎ সেই প্রাচীন কালেও মানুষ আবিষ্কার করেছিল টিনের আকরিক, এই ধাতুটি ব্যবহার করতে শিখেছিল নিজের প্রয়োজনে। প্রাচীন ভারতের মহেনজোদড়ো এবং হরপ্পা থেকেও ব্রোঞ্জের তৈরি অলংকার, অস্ত্রশস্ত্রও পাওয়া গেছে।
প্রকৃতির উদার বুকের গভীরে কাঁচা টিন বিশুদ্ধ অবস্থায় মেলে না, যা মেলে তা হল টিনের প্রধান আকরিক ক্যাসিটেরাইট বা টিনস্টোন। রসায়নবিদের ভাষায় টিন অকসাইড অর্থাৎ টিন আর অকসিজেন গ্যাসের সমন্বয়। এতে টিনের পরিমাণ শতকরা ৭৯ ভাগের মতো। ক্যাসিরাইট দেখতে ঝকঝকে, শরীরের রং কখনো বাদামী, সবুজ বা লাল, আবার কখনো বা কালো। কাচের মতোই কঠিন, তবে দারুণ ভারী, জলের প্রায় সাতগুণ।
গলিত ম্যাগমা নিঃসৃত তপ্ত-জল-জাত ক্যাসিটেরাইটের আদি জন্মভূমি গ্র্যানাইট জাতীয় পাথর। তবে পৃথিবীর বড় বড় টিনের খনির অবস্থান নদীর অববাহিকা অঞ্চলে, যেখানে আদি জন্মস্থান থেকে উদ্বাস্তু হয়ে ক্যাসিটেরাইট আশ্রয় নিয়েছে। রোদ-জল-হাওয়ার সংস্পর্শে টিনসমৃদ্ধ গ্র্যানাইট বা আনুষঙ্গিক পাথরে ভাঙন ধরলে প্রকৃতির সাধারণ নিয়মেই ভারী টিনের আকরিক নদীনালার স্রোতের সঙ্গে পরিক্রমা করে খানিকটা পথ। তবে নিজের ভারী দেহের জন্য দীর্ঘ পথ পেরোতে পারে না। আড্ডার আসর জমায় জন্মভূমির অদূরেই। মালয়েশিয়ার টিনের খনিজ ভাণ্ডার, আয়তনে যা পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে বড়, তারও জন্ম এভাবেই। এই খনিজ ভাণ্ডার দৈর্ঘ্যে ১৬০০ কিলোমিটার এবং প্রস্থে ২০০ কিলোমিটারের কাছাকাছি। মালয়েশিয়া ছাড়াও বলিভিয়া, চীন ও ইংল্যান্ড টিন উৎপাদনে অগ্রণী।
ভারতে বড় আকারের খননযোগ্য টিনের খনিজ ভাণ্ডার না থাকলেও বিহারের রাঁচি হাজারিবাগ ও গয়া জেলা এবং গুজরাটের পালানপুর ও বনসকণ্ঠ জেলায় সামান্য কিছু ক্যাসিটেরাইটের সন্ধান মিলেছে। তবে এর কোনটিই আপাতত লাভজনক নয়। সুতরাং ভারতকে নিজের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাতে নির্ভর করতে হচ্ছে বিদেশ থেকে বাৎসরিক প্রায় দশ কোটি টাকার টিন আমদানির ওপর।
- – - – - – - – - – - – - – - – -
তৃতীয় বর্ষ, প্রথম সংখ্যা, বৈশাখ, ১৩৮৪ সাল।
বানান অপরিবর্তিত রইল।