issue_cover
x

প্রাণিজগত্‌
বাঘরোলের বারোমাস্যা

উদবিড়ালে খুদ খায়
চালে নাচে ফিঙে
পুঁটিমাছে গীত গায়
মাগুর বাজায় শিঙে… ছোটবেলার ছড়া হিসেবে মুখে-মুখে আওড়ে গেলেও প্রশ্ন আসে না উদবিড়াল কী আর মেছোবিড়ালই বা আসলে কী… বাস্তবে কতজনই বা খোঁজ রাখে পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য-পশু (State animal) কোনটি। বছর দুই আগের খবরের কাগজের জেলার পাতায় ছোট্ট একটা খবর, হাও়ড়ার জনাকয়েক যুবক পিটিয়ে মেরে ফেলেছে বাঘের মতো দেখতে এক জন্তুকে। খবরের সূত্র তাদের ফেসবুক পোস্টের উল্লাস। সেই শুরু, বা বলা যেতে পারে বাঘরোল নামক যে একটা প্রাণী রয়েছে তার সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হওয়া গিয়েছিল সেবারই। তাতে অবশ্য পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য-পশুর বিপন্নতা বিশেষ কমেনি। কিন্তু বাঘরোল আর মেছোবিড়ালের সম্পর্ক ঠিক কী? আগে বলি উদবেড়ালের কথা। নামে ‘বেড়াল’ থাকলেও সে আসলে একরকমের ভোঁদড়। আর বাঘরোলকে ভাল বাংলায় বলে মেছোবিড়াল, বাঘ না হলেও সে আদতে বাঘের মাসি। কিন্তু গৃহস্থ বিড়ালের চেয়েও দুর্দশাময় তাদের জীবন। আপাত মুখচোরা নিরীহ প্রাণীটির তকমা জুটেছে ‘মাছচোরের’, অথচ কেউ কখনও এটা ভাবে না যে পরের পর বাড়ি তুলে জলাভূমি বুজিয়ে দিলে বাঘরোলদের আদত বাসস্থানটি নষ্ট হয়ে যায়। বাঘরোলের আবাস পশ্চিমবঙ্গ-সহ ভারত এবং দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশে। মাছেভাতে বাঙালির সঙ্গে খাদ্যাভ্যাসে অনেক মিল মেছোবিড়ালের। বন দফতরের একাধিক সূত্র জানাচ্ছে, সত্তরের দশকে বাংলার রাজ্য-পশু অ্যাখ্যা জোটে তাদের কপালে। কিন্তু তাদের খাদ্য ও বাসস্থান নিয়ে সরকার আদৌ চিন্তিত কি না, সে বিষয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। এদের নিয়ে অবশ্য গবেষণা করছেন রাজ্যেরই কিছু গবেষক, তাতেই জানা গিয়েছে ‘মাছচোর’ তকমা পেয়ে জীবন হারানো ও আরও নানা অত্যাচারের কাহিনি।
প্রাণী-গবেষকদের মতে, মাত্রাছাড়া নগরায়ণের ফলে জলাভূমি বোজানো হচ্ছে, অন্যদিকে পানের চাষ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বাঘরোলদের স্বাভাবিক বাসস্থান খড়িঘাসের বন হয়ে যাচ্ছে বিলুপ্ত। খেতে পাচ্ছে না মেছোবিড়ালরা, আর সে-কারণে মুরগি, ছাগল মেরে মানুষের রাগের কারণ হয়ে উঠছে তারা। বাঘরোল মারা যে অপরাধ, সেই ব্যাপারে সচেতনতারও অভাব রয়েছে। হাওড়া এবং হুগলির জলাভূমি অঞ্চলে একসময় প্রচুর বাঘরোলের আবাস ছিল, কিন্তু এখন? হাওড়ার কামারখালি, ঝামটিয়া, কুশবেড়িয়া প্রভৃতি গ্রামে এখনো কায়ক্লেশে এক-দুটোর দেখা মেলে। গত শতক থেকেই অস্বাভাবিক হারে কমতে লেগেছে বাঘরোলের সংখ্যা।
সাধারণ বিড়ালের চেয়ে একটু বড় আকৃতির এই প্রাণীগুলোর গায়ের রং ধূসর হলুদ, চাকা-চাকা দাগ রয়েছে গায়ে। পুরুষ বাঘরোলের ওজন ১৫ থেকে ১৮ কেজি। স্বভাবে নিশাচর, লাজুক। খাদ্য মূলত মাছ আর মেঠো ইঁদুর। বিজ্ঞানসম্মত নাম প্রায়োনেইলুরাস ভিভেরিনাস। ২০১৬ সালে ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজ়ার্ভেশন অফ নেচারের রেড লিস্টে এসে যায় হতভাগ্য এই প্রাণীগুলো। এই লিস্টে একমাত্র বিলুপ্ত হতে চলেছে এমন প্রাণীরই নাম পাওয়া যায়। অতএব, সভ্যতার বিষের সঙ্গে লড়াই করে কতদিন টিকে থাকা যায়, এটাই মেছোবিড়ালদের জীবনের লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।

শ্রেয়া ঠাকুর

সাদা রক্তের মাছ তুষারমৎস্য

মেরুদণ্ডী, অথচ তার রক্তের র‌ং লাল নয়। হওয়ার কথাও নয়। এদের রক্তে না আছে হিমোগ্লোবিন, না-ই আছে লোহিত রক্তকণিকা। আন্টার্কটিকাকে ঘিরে থাকা দক্ষিণ মহাসাগরে দুধ-সাদা রংয়ের রক্তের এই মাছের নাম যে-কারণে দেওয়া হয়েছে তুষারমৎস্য (ইংরেজিতে Icefish)।

কিন্তু আমাদের শরীরের কোষে-কোষে অক্সিজেন পৌঁছে দেয় তো লোহিতকণিকাই। হিমোগ্লোবিনই অক্সিজেনকে বেঁধেছেদে ধরে রাখে লোহিতকণিকার পেটে। সেই হিমোগ্লোবিন আর লোহিতকণিকার অনুপস্থিতিতে প্রচণ্ড ঠান্ডা জলের মধ্যে এরা তা হলে বেঁচে থাকে কী করে?
জানা গিয়েছে, তুষারমৎস্যদের হৃৎপিণ্ডই বলো কিংবা রক্তবাহ (যাদের মধ্য দিয়ে রক্ত আমাদের সারা শরীরে বইতে থাকে নিরন্তর), সবই স্বাভাবিকের চেয়ে অনেকটা বড়। ফলে এদের শরীরে রক্ত চলাচল হয় অনেক বেশি দ্রুত গতিতে। হিমোগ্লোবিন না থাকায় রক্তে অক্সিজেনের পরিমাণ অন্যান্য মেরুদণ্ডী প্রাণীর তুলনায় মাত্র ১০% হলেও তুষারমৎস্যেরা অতএব বেঁচে থাকে দিব্যি। অক্সিজেন কম পৌঁছলেও তাড়াতাড়ি তো পৌঁছচ্ছে। বেঁচে থাকার জন্য সেই বা কম কী!

লোহিতকণিকা না থাকায় তুষারমৎস্যের ফ্যাকাসে রক্তের ঘনত্বও অনেকটা কম হয়। ফলে দ্রুতগতিতে তা চলাচল করতে পারে আরও ভাল। বিজ্ঞানীদের ধারণা অত্যন্ত ঠান্ডা জলে অক্সিজেনের পরিমাণ বেশি থাকার ফলেই প্রকৃতি এদের রক্তকে এমন ভাবে তৈরি করেছে। আশপাশ যখন অক্সিজেনে ভুরভুর, খামোখা রক্তে তা বয়ে বেড়ানোর কোনও মানে আছে কি? ঠিক কি না?