issue_cover
x
Featurelist detail

z মুক্তার জন্মকাহিনি
দুলেন্দ্র ভৌমিক

আমার নাম মুক্তা। আমাকে তোমরা অনেকেই দেখেছো। কারো গলার মালায়, কারো কানের দুলে কিংবা কারো কারো হাতের আংটিতে। আমার নাম জানে না এমন লোক আজ আর পৃথিবীতে নেই। তোমরা নিশ্চয়ই জান, আমি এক মহামূল্যবান রত্ন। ঐতিহাসিকরা বলেন, অনেকঅনেক কাল আগে থেকেই নাকি আমি মানুষের পরিচিত রত্ন। সেই অনেক কাল আগের সময়টাকে বলা হয় প্রাগৈতিহাসিক যুগ।
কিন্তু সে যুগের মানুষ তো তোমাদের মতো সব দিক থেকে এত উন্নত ছিল না, তাই আমার সম্পর্কে তখনকার মানুষদের ধারণা ছিল হাস্যকর। আমার জন্ম সম্পর্কে কেউ সঠিক কিছু জানত না বলে তাদের মধ্যে অনেক রকম ধারণা চালু ছিল, যা শুনলে আমার মতো তোমরাও হাসবে। যেমন, একদল মানুষ মনে করত, শিশিরবিন্দু থেকেই নাকি আমার জন্ম। আবার আরব দেশের লোকেরা বলত, ঝিনুক খুব ভোরবেলা জলের ওপর ভেসে উঠে শিশিরবিন্দু খায়। সেই সময় ঝিনুকের দেহের ওপর সূর্যের আলো পড়ে। সূর্যের আলো আর বাতাসের প্রভাবে ঝিনুকের দেহের মধ্যেকার শিশিরবিন্দু আস্তে আস্তে কঠিন হয়ে গিয়ে আমার জন্ম।

তোমরাই বল নিজের জন্ম সম্পর্কে এসব আজগুবি কথা শুনলে কার না হাসি পায়। প্রায় সপ্তদশ শতাব্দী পর্যন্ত আমার জন্ম নিয়ে মানুষের মধ্যে এ রকম নানা আজগুবি মত চালু ছিল। কিন্তু ঐ সপ্তদশ শতাব্দীতেই রেমা নামে এক বিজ্ঞানী এবং তারো পরে ফরাসী দেশের বিজ্ঞানী লিনে অনেক গবেষণা করে আমার জন্ম সম্পর্কে ঠিকঠাক কথা বলতে আরম্ভ করেন। তাঁদের কথার মূল বিষয়টা তোমাদের বলি, তাহলেই আমার জন্মের ব্যাপারটা বুঝতে পারবে, ঝিনুকের খোলার মধ্যে খুব সাবধানে একটি ছোট ফুটো করে তার মধ্যে যদি কোন ‘উত্তেজক বস্তু’ অর্থাত্ একটি বালুকণা, কাঠের গুঁড়োর একটু দানা অথবা ছোট্ট একটি পাথর কুচি ঢুকিয়ে দেওয়া যায়, তবে সেটা বহুদিন পরে মুক্তায় পরিণত হয়। কথাটা ঠিক। এই ভাবেই কিন্তু আমার জন্ম হয় সমুদ্রের তলায়।
কিন্তু এখানে একটা কথা বলে রাখি। মানুষের দল ঝিনুকের খোলার মধ্যে ওই ভাবে বালুকণা কিংবা পাথরকুচি ঢুকিয়ে আমাকে তৈরি করবার আগেও তো পৃথিবীতে আমরা ছিলাম। অতএব, আমাদের জন্মের সব বাহাদুরিটাই তো মানুষের নয়! তখন আমরা আপনা থেকেই জন্মাতাম, এখনো জন্মাই। কেমন করে জানো? সমুদ্রের তলায় জলের মধ্যে ঘুরে বেড়াতে বেড়াতে কখনো কখনো বালুকণা বা পাথর কুচির ক্ষুদ্র কণা হঠাত্ করে ঢুকে পড়ে ঝিনুকের শাঁসালো শরীরে। যেমন মাঠে খেলতে খেলতে হঠাত্ করে তোমাদের পায়ে কাঁটা ফুটে যায়, কিংবা এক বিন্দু কয়লার গুঁড়ো গিয়ে পড়ে তোমাদের চোখের মধ্যে ঠিক তেমনি ভাবেই ঘটে ব্যাপারটা। আর যেই না ভেতরে আসা অমনি শুক্তির ভেতরকার পাতলা মসৃণ পদার্থ নিজে বাঁচবার জন্যে তরল পদার্থের স্তরের প্রলেপ দিয়ে, ওই বালুকণাটিকে ঢেকে ফেলে। স্তরটা হয় যেন পেঁয়াজের খোলার মতোএকটার পর একটা। ব্যাস, এই ভাবে কয়েক বছর থাকতে থাকতে ওরই মধ্যে জন্ম নেয় আসল মুক্তা, অর্থাত্ আমরা। আর মানুষেরা যা তৈরি করে, তাকে তো মানুষেরাই বলে কৃত্রিম মুক্তা।
সোনা যেমন খনি থেকে পাওয়া যায়, আমাকে তেমন ভাবে পাওয়া যায় না। আমাকে বেশি করে পেতে হলে আমার চাষ করতে হয়। এখন সারা পৃথিবীতে আমাকে পাবার জন্য ঠিক এই ভাবেই কৃত্রিম মুক্তার চাষ চলছে।
mukta_kahini_f2

আমি জানি, তোমরা আমার কথা শুনে ভাবছ, ঝিনুকের খোলার মধ্যে বালুকণা কিংবা পাথর কুচি ঢুকিয়ে দিলেই তা online casino gids থেকে মুক্তা হবে কেমন করে? তবে শোন, আমার জন্ম বৃত্তান্ত। ‘শুক্তি’ বলে এক ধরণের সামুদ্রিক প্রাণী আছে। এরা মেরুদণ্ডহীন, প্রায় ঝিনুকের মতো। এদের দেহ খুব কোমল এবং স্পর্শকাতর। অর্থাত্ হাত ছোঁয়ালেই শামুকের মতো গুটিয়ে যায়। শুক্তির ভেতরে থাকে থাকে পাতলা, মসৃণ এবং খুব উজ্জ্বল একরকম জিনিস। যার কথা আগে বলেছি। এটাই আমার জন্মের মূল বলতে পারো। ইংরেজিতে তাই একে বলা হয় ‘Mother of Pearl’। হঁ্যা, আমার মা-ই বটে। বাইরে থেকে ঢুকিয়ে দেওয়া জিনিস ভেতরে আসামাত্র আমার মা, অর্থাত্ ওই উজ্জ্বল তরল পদার্থ তার প্রলেপ দিয়ে বালুকণা বা পাথরকুচিটিকে স্তরে স্তরে ঘিরে ফেলে। ওই স্তরের মধ্যে অনেক দিন থাকতে থাকতেই আমার জন্ম হয়। ছিলাম ক্ষুদ্র বালুকণা বা পাথরকুচি, মায়ের গভীর মমতার আবরণে থাকতে থাকতে হয়ে গেলাম মনোহর মুক্তা।

শুনেছি আমার চাষ প্রথম করেন চীন দেশের এক ভদ্রলোক। নাম তার ই-জিন-ইয়াং। তবে মানুষের মধ্যে সবাই যেমন দেখতে সমান সুন্দর নয়, তেমনি আমাদের মধ্যেও দেখতে ভাল-মন্দ আছে। দেখতে ভাল, গুণেও উত্‌কৃষ্ট এই ধরণের মুক্তা চাষের কৃতিত্ব কিন্তু এক জাপানী ভদ্রলোকের, নাম তার কোকিচি মিকিমাটো।

আমার মতে সুন্দর সুন্দর কৃত্রিম মুক্তা ভাইদের জন্মে এই মানুষটির কৃতিত্ব অনেক। হাজার হাজার শ্রমিক কাজ করে মিকিমাটো বাবুর মুক্তা চাষের কারবারে। মেয়ে শ্রমিকরা করে ডুবুরির কাজ। অর্থাত্ ওরাই ডুব দিয়ে সমুদ্রের তলা থেকে তুলে আনে আমাদের। মার্চ মাস থেকে ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত চলে এই কাজ। তখন সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে মেয়ে ডুবুরির দল তাদের কাজ শুরু করে দেয়। ঘণ্টা দুয়েক কাজ তাদের। সমুদ্রের নিচে পৌঁছে ৬০ থেকে ৮০ সেকেন্ড পর্যন্ত ডুবুরিরা থাকতে পারে। কিন্তু অতটুকু সময়ের মধ্যেই এক একজন দক্ষ ডুবুরি ৮ থেকে ১০টা পর্যন্ত শুক্তি তুলে আনতে পারে। আর ওই শুক্তির মধ্যেই থাকি আমরা।
মিকিমাটো বাবু যেভাবে আমাদের চাষ করেন, সেটা নিশ্চয়ই তোমাদের খুব শুনতে ইচ্ছে করছে? করবেই তো, আমি নিজেও তো কতবার শুনেছি আমার নিজেরই জন্মবৃত্তান্ত। উনি চাষ করেন এগো উপসাগরে। ওখানে একজাতীয় শুক্তিকে প্রথমে ছেড়ে দেওয়া হয়। এমন জায়গায় ছাড়া হয় যেখানকার জল হবে অগভীর। ওই অগভীর জলে শুক্তিগুলো সমুদ্রের আগাছা, শিলা প্রভৃতির সঙ্গে নিজেদের আটকে রাখে। জুলাই-আগস্ট মাস নাগাদ শ্রমিকরা অগভীর জলে, যেখানে শুক্তিদের ডিম পাড়ার আশা আছে, সে সব জায়গায় পাথরের টুকরো ফেলে দেয়। ডিমগুলো আশ্রয় নেয় সেই ফেলে দেওয়া পাথরের ওপর। তিন বছর পরে শিশু শুক্তিগুলো বড় হয়ে উঠলে তখন তাদের তুলে এনে অভিজ্ঞ শ্রমিকরা খুব সাবধানে তাদের খোলার মধ্যে দিয়ে বালুকণা, পাথরকুচি, এক কণা কাঠের গুঁড়ো এরকম কোন একটা বস্তু ঢুকিয়ে দেয়। তারপর আমার শুক্তি মায়েদের নিয়ে যাওয়া হয় গভীর জলে। সেখানে এক ফুট অন্তর অন্তর তাদের ছেড়ে দিয়ে আসে। আর দিনের পর দিন শুক্তি মায়েদের খোলার মধ্যে ওই তরল উজ্জ্বল স্তরের আবরণের মধ্যে থাকতে থাকতে আমরা, অর্থাত্ মুক্তার দল জন্মলাভ করি। ডুবুরিরা গিয়ে আমাদেরই সংগ্রহ করে আনে। তখন শুক্তির খোল খুললেই আমাদের দেখতে পাওয়া যায়।
muktar_kahini_f3
তাই বলে ভেবো না আমরা সমুদ্রের তলায় খুব আরামে থাকি। সমুদ্রে আমাদের শত্রুর অভাব নেই। বিশেষ করে অক্টোপাস, ওরা তো আমাদের দেখলেই গাণ্ডেপিণ্ডে ধরে খায়। তাই সমুদ্রের তলাতেও থাকতে হয় খুব সাবধানে। কতদিন থাকতে হয় জানো? প্রায় চার বছর। চার বছর পর আমাদের তুলে আনা হয়। কিন্তু এত কাণ্ড করেও শেষে দেখা যায়, একশোটির মধ্যে মাত্র ৫-৬টি মুক্তা বাজারে চড়া দামে বিক্রী করার মতো। বাকী মুক্তাভাইরা প্রায় সবই নিচু ধরনের। যার অধিকাংশই অনেকটা তোমাদের বিকলাঙ্গ মানুষের মতো অকেজো। এখন নিশ্চয়ই বুঝতে পারছো, কত কাণ্ড করে পেতে হয় আমার মতো একদানা মুক্তামণিকে। অতএব আমার মূল্য যে মহামূল্যবান হবে তাতো জানা কথাই। দামের কথা যদি বল, তবে সারা পৃথিবীতে এখনো টেক্কা দিয়ে যাচ্ছি আমরা, অর্থাত্ আসল মুক্তার দল। রূপে কিংবা জৌলুষে আমাদের ধারেকাছে ওরা ঘেঁষতে পারে না।

………………………………………………………………………………………………………………………………………..

প্রথম বর্ষ, তৃতীয় সংখ্যা, আষাঢ়, ১৩৮২ সাল।<br /> (বানান অপরিবর্তিত রাখা হল।)