issue_cover
x
Featurelist detail

z সমুদ্রের দৈত্য
সন্দীপ সরকার

তিমিকে সমুদ্রের দৈত্য ছাড়া কী-ই বা বলা চলে? খৃষ্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দীতে গ্রীস দেশের প্রখ্যাত দার্শনিক-বৈজ্ঞানিক অ্যারিস্টটল বুঝতে পেরেছিলেন, তিমি মাছ নয়, জলচর জন্তু। স্তন্যপায়ী। পৃথিবীতে এত বড় জন্তু আর দেখা দেয়নি। নীল তিমি হল সবচেয়ে বড় জাতের তিমি। প্রাগৈতিহাসিক জন্তু ডা‌ইনোসর পর্যন্ত নীল তিমির চাইতে আকারে ছোট। নীল তিমি লম্বায় নব্বই থেকে একশ ফুট পর্যন্ত হয়, দেহের ওজন দুশো টন বা তেত্রিশটা আফ্রিকান হাতির সমান। সবচেয়ে ছোট্টখাটোট জাতের তিমিও দৈর্ঘ্যে ন-ফুট। জন্মের সময় তিমির বাচ্চার দেহের ওজন দেড় থেকে চার টন পর্যন্ত হয়। বছরদুয়েকের মধ্যে তার ওজন বাড়ে ত্রিশ থেকে চল্লিশ হাজার পাউন্ড।
তিমিকে মানুষ দেখেছে বিস্ময়ের চোখে। কখনো ভয় আর ভক্তিতে সে চোখ বুজে ফেলেছে। তিমি সম্বন্ধে কিংবদন্তী আর উপকথা চালু আছে নানান দেশে। মানুষের আঁকা ছবিতে আর লেখা তার ছাপ পর্যন্ত পড়েছে। ক্রীট দ্বীপের প্রাচীন সভ্যতার উদাহরণ হল, মিনোয়ান রাজ্যের রাজধানী নোসস। এই নোসসের এক মন্দিরে চার হাজার বছর আগে কোনো এক শিল্পী দেওয়ালচিত্রে এঁকেছেন তিমি। গ্রীস আর রোমের মন্দিরের গায়েও সে নিজের জায়গা করে নিয়েছিল। গল্পে আছে সিন্ধুবাদ নাবিক সমুদ্রে ভাসমান তিমির পিঠকে দ্বীপ বলে ভুল করে সেখানে রান্নার আয়োজন করেছিল। শেষে আগুন জ্বালতেই তিমি হুশ করে ডুব দেয়। গত শতাব্দীতে তিমি শিকারের শ্রেষ্ঠ রূপ কাহিনী ‘মবি ডিক’ লেখেন হারমেন মেলভিল।
তিমি বহু আগে স্থলচর ছিল। বিজ্ঞানীরা প্রমাণ পেয়েছেন, ছ-লক্ষ বছর আগে এক দল লোমশ চারপেয়ে স্তন্যপায়ী, খাবার বা আশ্রয়ের খোঁজে জলে নেমেছিল। বহুকাল জলে থাকতে থাকতে পেছনের পা দুটোর বদলে দেখা দিল লেজ। দেখতে মাছের লেজের মতো অনেকটা। তফাত হল তিমির লেজ খাড়া নয় শোয়ানো, তাই ডাইনে-বাঁয়ে নাড়া যায় না। কিন্তু ওপরে-নীচে নাড়ে। তেমনি সামনের হাতের বদলে গজাল পাখনা। জলে থাকার ফলে এক সময় লোমের বদলে মোটা পুরো চর্বির আস্তরণ গজাল। একেই বলে ব্লবার, গলালে খুব ভাল তেল হয়। মাছের সঙ্গে তিমির কয়েকটা পার্থক্যের মধ্যে একটা হল মাছের মতো সে ডিম পাড়ে না। মানুষের মতো তারও বাচ্চা হয় একটা একটা করে। মা তিমি বাচ্চাকে বুকের দুধ খাওয়ায় দিনে চল্লিশ বার অর্থাৎ পাঁচশ পঞ্চাশ লিটার বা হরিণঘাটার এক হাজার একশ বোতল দুধ। তবে সে দুধ নাকি যেমন খাঁটি তেমনি পুষ্টিকর। তাতে আমিষের ভাগটাই বেশি। হাজার হোক তিমির দুধ বলে কথা!
মাছের সঙ্গে আরেকটা বড় রকমের তফাত হল, তিমি ফুসফুস দিয়ে নিশ্বাস নেয়। জলে থাকার দরুন নাকের ফুটো মাথার ওপরে সরে গেছে। জলের নীচে ডুব দিয়ে বহুক্ষণ থাকে। যখন দম নেবার জন্যে জলের ওপর মাথা তোলে, তখন তার মাথার ওপর কুড়ি ফুট পর্যন্ত উঁচু ফোয়ারার মতো দেখা যায়। ফোয়ারা দেখেই জাহাজীরা বোঝে, তিমি। বৈজ্ঞানিকদের মতে এটার মধ্যে জলের ভাগ খুব সামান্য। ফুসফুস থেকে নিশ্বাসের জমাট হাওয়া বাইরে এলে এই হয় অবস্থা। শীতের ভোরে কথা বলতে গেলে আমাদের মুখ থেকে যেমন ধোঁয়া বেরোয়, এও তাই।
মানুষের চেয়ে তিমির মগজের ওজন বেশি। স্পার্ম জাতের তিমির মাথার ঘিলুর ওজন কুড়ি পাউন্ড। এত ‘ধূসর পদার্থ’ আর কোনো প্রাণীরই মাথায় নেই। মানুষেরও না। মানুষের মতোই তিমির আয়ু আশি বছর। কোনো কোনো তিমি স্ত্রী-ছেলেমেয়ে নিয়ে সংসার করে। দল বাঁধে। চাঁদনী রাতে সমুদ্রে খেলা করে। একজন বিপদে পড়লে অন্যরা ছুটে আসে। মানুষের মতো ভ্রমণ করতে ভালবাসে। গ্রীষ্মকালে মেরু অঞ্চলে যখন বরফ গলে তখন তারা সেখানে খাবার খুঁজতে হাজির হয়। এইখানেই তাদের বাচ্চা হয়। শীত পড়লে উষ্ণতর অঞ্চলে ফেরে। আবার মানুষেরই মতো তাদের নিউমোনিয়া, টি বি, ক্রিমি হয়। এমন কী, তিমিদের দলে দলে আত্মহত্যা করতেও দেখা গেছে। তারা নিজেদের ভাষায় কথাবার্তা বলে। ডাঙার জীব হয়েও তারা জলের পরিবেশে নিজেদের খাপ খাইয়ে নিয়েছে। মুখ থেকে গুরুগম্ভীর আওয়াজ ভীষণ জোরে ছুঁড়ে দিয়ে, জলের মধ্যে ধ্বনি প্রতিধ্বনি শুনেই তারা ধরতে পারে চারপাশের জায়গাটা কেমন।
তিমি শিকার কিন্তু খুব পুরনো ব্যাপার। নরওয়েতে তিমির কঙ্কালের সঙ্গে চার হাজার বছরের পুরনো পাথরের ‘হারপুন’ পাওয়া গেছে। হারপুন এক রকম বর্শা, যা ছুঁড়ে তিমি শিকার করা হয়। হারপুনের পেছনে দড়ি বাঁধা থাকে। নৌকার মধ্যে লাগানো বিরাট চরকির মতো হুইল থেকে দড়ি খুলতে থাকে। অনেক সময় আহত তিমির ঝটাপটিতে দড়ি ছিঁড়ে নৌকো উল্টে যেত। ১৮৬০ সালে স্‌ভেন্ড ফোয়েন বন্দুক থেকে ছোঁড়া যায় এমন হারপুন বানালেন। এর আগায় আবার বোমা লাগানো। এমন বন্দুক হারপুন হাতে নিয়ে কলের নৌকো বা জাহাজে চেপে তাড়া করলে তিমি পারবে কেন? তাছাড়া গত শতাব্দী থেকে গ্রীষ্মকালে শিকারীরা মেরু অঞ্চলে যেতে শুরু করল। খাবার যোগাড়ে আর বাচ্চা হবার জন্যে হাজার হাজার তিমি প্রতি বছর এইখানে এসে শিকারীদের হাতে প্রাণ দেয়।
দ্বাদশ শতাব্দীতে স্পেনের বাস্ক উপজাতির লোকেরা যেভাবে তিমি শিকার করত তার মধ্যে দুঃসাহস ছিল। এখনও পুরনো কায়দায় তিমি শিকার করে এসকিমোরা। উত্তর মেরু অঞ্চলের সমুদ্রের দারে তারা চটপট সীলের চামড়ার নৌকায় চেপে তাড়া করে। চৌখস শিকারী হলেও তারা কিন্তু আদিম মানুষ, বিশ্বাস করে। তিমি নিজে না ধরা দিলে কেউ তাকে ধরতে পারে না।
তিমির মাংস জাপানীরা ভালবাসে। সেখানে দুপুরে খাবার সঙ্গে স্কুলের ছেলে-মেয়েদের তিমির মাংস দেওয়া হয়। তিমি মাছ শিকার করার জাহাজ আর নৌকা, কাটাকুটি করার কারখানা, এককালে আমেরিকারই ছিল বেশি। এখন জাপানের। ষাট টন ওজনের তিমির মাংস আলাদা করে চর্বি গলিয়ে হাড় পিষে তেল বানিয়ে ফেলা যায় ঘণ্টাখানেকের মধ্যে। স্পার্ম জাতের তিমি শিকার করে অস্ট্রেলিয়া। স্পার্মের মাথার ঘিলু থেকে যে তেল বেরোয় তা কারখানার যন্ত্রপাতি চালু রাখার পক্ষে সবচেয়ে ভাল। সৌভাগ্যের বিষয় এখন জোজোবা বীন থেকে চমৎকার তেল তৈরী হচ্ছে। এর জন্যেই হয়তো স্পার্ম তিমি বেঁচে যাবে।
ভারী সুন্দর এই অতিকায় সামুদ্রিক দৈত্যগুলো। সফেন ঢেউয়ে লুটোপুটি খায়, হুটোপাটি করে। এখন নিশ্চিহ্ন হতে বসেছে। বহু দেশ তাই তিমি সংরক্ষণের জোর চেষ্টা চালাচ্ছে।

বানান অপরিবর্তিত রইল।