issue_cover
x

z টারকানা বয়— পনেরো লক্ষ বছর বয়সি ‘আট বছুরে’ বালক

তার কোড নেম KNM-WT 15000, প্রজাতি ‘হোমো ইরেকটাস’, কিন্তু আসলে সে এক আট বছরের বালক যে আজ থেকে ঠিক পনেরো লক্ষ বছর আগে কেনিয়ার লেক টারকানার আশপাশে ঘুরে বেড়াত। তারপর, ১৯৮৪ সালে এক জীবাশ্ম সংগ্রহকারী, কামোয়া কিমু, তার কঙ্কাল খুঁজে বের করে সেই টারকানা লেকের কাছেই নারিওকোটোম নামক এক স্থান থেকে। তিনি কাজ করতেন রিচার্ড লিকে নামক এক প্যালিওঅন্টোলজিস্টের সঙ্গে। প্যালিওঅন্টোলজি হল বিজ্ঞানের সেই শাখা যেখানে প্রাণী ও উদ্ভিদের ফসিল নিয়ে লেখাপড়া করা হয়। কিন্তু কথা হচ্ছে, প্রাচীন মানবের নানা ফসিলাইজ়ড অংশের আবিষ্কার তো হয়েছে আরও, ‘টারকানা বয়’-এর বৈশিষ্ট্য কী?
বৈশিষ্ট্য এটাই, প্রথমদিকে আবিষ্কৃত ফসিলগুলির মধ্যে এটি সবচেয়ে সম্পূর্ণ। ৫ ফুট ৬ ইঞ্চি লম্বা এই হোমো ইরেকটাস এই বালকের কঙ্কাল জানতে সাহায্য করে যে, তার স্বজাতিরা সোজা হয়ে দাঁড়াতে সক্ষম ছিল,আগুনের নিয়ন্ত্রণ শিখেছিল, অস্ত্র তৈরি করে নিয়মিত শিকার করত এবং দলবদ্ধভাবে বাস করত। টারকানা বয় -এর মস্তিষ্কের মাপ ৯৩৩ কিউবিক সেন্টিমিটার, যা একটি পূর্ণবয়স্ক শিম্পাঞ্জির দ্বিগুণ এবং বর্তমান মানবপ্রজাতির মস্তিষ্কের প্রায় ৭৫ শতাংশ । এই বালকের ‘ব্রোকাজ় এরিয়া’ পূর্ণরূপে গঠিত। কী এই ব্রোকাজ় এরিয়া? এটি হল মস্তিষ্কের বাঁ গোলার্ধের সামনের অংশ যা কথা বলতে সাহায্য করে। অর্থাৎ ‘টারকানা বয়’ কথা বলতে পারত। কিন্তু কী এমন হয়েছিল যে মাত্র আট-নয় বছর বয়সেই তার মৃত্যু হল?
বি়জ্ঞানীরা খুঁজে পেতে দেখিয়েছেন ‘টারকানা বয়’-এর মৃত্যুর কারণ জিঞ্জিভাইটিস, যা হল দাঁতের মাড়ির অসুখ। ছোটদের দাঁত মাজায় অ্যালার্জি তখনও যে ছিল তার একটা প্রমাণ আর কী!
‘টারকানা বয়’-এর গল্পটা অবিকল আমাদের নিজের পরিবারে একটা শিশুর বড় হয়ে ওঠার মতো ঘটনাবহুল।

শ্রেয়া ঠাকুর

ইনকাদের কথা বলা গিঁট- কুইপু


“ ‘হ্যাঁ, গাঁটপড়া রঙিন খানিকটা সাধারণ সুতলি?’ ঘনাদা আমাদের দিকে সকৌতুক অনুকম্পার সঙ্গে তাকিয়ে বললেন, ‘ওই সুতোর জট ক’টা পেলে, আমেরিকা এ পর্যন্ত সারা পৃথিবীতে যেখানে যত ধার দিয়েছে, সব শোধ করে দেওয়া যায়। শুধু ওই গাঁটপড়া সুতলি ক’টার জন্য গত সওয়া চারশো বছরে সওয়া চার হাজার মানুষ অন্তত প্রাণ দিয়েছে!’ ”
ঘনাদার ‘সুতো’ গল্প থেকে আমরা অনেকেই প্রথম ‘কিপু’ শব্দটা জানতে পারি, আর জানতে পারি প্রাচীন ইনকা সভ্যতার সঙ্গে তার গভীর যোগাযোগের কথা। ঘনাদার মুখের কথা কেড়ে নিলে বলতে হয়, “ইনকাদের কোনও লিখিত ভাষা ছিল না। তাঁরা যে ভাষায় কথা কইতেন তার নাম কেচুয়া (মতান্তরে কোয়েচুয়া)। প্রধান পুরোহিত তাঁর সংকেত-চিহ্ন তাই ভাষার অক্ষরে লিখে যাননি। তিনি সংকেতগুলি যাতে রেখে গিয়েছিলেন তাকে বলে কিপু।” কুইপু বা কিপু আদতে স্প্যানিশ শব্দ। এই শব্দটির আদি উচ্চারণ হল খিপু (khipu)এবং অর্থ হল গিঁট। এই শব্দটি ইনকাদের কুজ়কো শহরের আঞ্চলিক কোয়েচুয়া (Quechua) ভাষার শব্দ। এই ভাষার মহাপ্রাণ খ ধ্বনিটি অন্যান্য আঞ্চলিক ভাষায় ক হিসাবে উচ্চারিত হয়। এই বিচারে খিপু শব্দটি দাঁড়ায় কিপু, আরও অপভ্রংশ করলে কুইপু। কিন্তু এই কিপু বা কুইপু ব্যাপারটা আদতে কী?
কিপু বা কুইপু হল দক্ষিণ আমেরিকার ইনকা সভ্যতায় সংখ্যালিখন পদ্ধতি বিশেষ। প্রাচীন এই ইনকা সভ্যতার সাম্রাজ্য দক্ষিণ আমেরিকার ইকুয়েডর থেকে মধ্য চিলি পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। এর মূল শহর কুজকো (Cuzco) ছিল পেরুর দক্ষিণাঞ্চলের আন্দিজ পার্বত্য অঞ্চলে। যতটুকু জানা যায় ইনকা সভ্যতায় কোন অক্ষরভিত্তিক বা চিত্রভিত্তিক সংখ্যালিখন পদ্ধতি ছিল না। এরা সুতোতে গিঁট দিয়ে সংখ্যা নির্ধারণ বা গণন কার্য সম্পন্ন কর। এই গিঁটওয়ালা সুতোটিকে বলা হয়ে থাকে কুইপু। এই সভ্যতার সম্রাট থেকে সর্বসাধারণ এই লিখন পদ্ধতি ব্যবহার করত। এ পর্যন্ত বিভিন্ন জাদুঘর ও ব্যক্তিগত সংগ্রহে প্রায় ৬০০ কুইপুর সন্ধান পাওয়া গিয়েছে।
কিন্তু কুইপু দেখে গণনা করা হত কীভাবে?
এই পদ্ধতিতে একটা মূল সুতো থেকে আনুষঙ্গিক অনেকগুলো ছো়ট-ছোট সুতো ঝোলানো হত, এবং এই সুতোগুলোতে নির্দিষ্ট দূরত্ব অন্তর গিঁট দেওয়া হত। সুতো তৈরি করা হত আলপাকা বা লামার গায়ের রোম দিয়ে। সুতোর ধরন, গিঁটের সংখ্যা আর সুতোর রংয়ের উপর নির্ভর করে হিসেব কষা হত। সুতোর রং লাল হলে ধরে নেওয়া হত তা যুদ্ধকে নির্দেশ করছে, সুতোর রং যদি সাদা হত তবে তা শান্তি ও ধনলাভকে নির্দেশ করত। প্রতিটি একক গিঁটের মান ১০ করে বাড়তে থাকত। উচ্চমান যুক্ত গিঁটগুলো দেওয়া হত মূল সুতোর কাছে। আর সবচেয়ে নীচের গিঁটের মান হত একক মান বিশিষ্ট। অর্থাৎ মূল সুতোর কাছের গিঁটের মান যদি ১০০ হয় তবে একদম নীচের গিঁটের মান হবে ১০।
কুইপুর সামাজিক গুরুত্ব অসীম, জনসংখ্যা, মাস, বছর, কর সমস্ত কিছুই এর মাধ্যমে হিসেব করা যেত। এমনকী স্থানীয় জমি বণ্টন, সরকারি সিদ্ধান্ততেও কুইপুর প্রয়োজনীয়তা ছিল। পেরুতে যেসব নৃতত্ত্ববিদ ও প্রত্নতত্ত্ববিদেরা কুইপু নিয়ে কাজ করছেন তাঁরা জানিয়েছেন পেরুর দুটো অঞ্চলে এখনও প্রাচীন রীতি মেনে কুইপু ব্যবহার করা হয়, একটি San Andres de Tupicocha, আর-একটি San Cristobal de Rapaz।
কুইপু আদতে একটা রহস্যময় মজার জিনিস, তাকে ঘিরে রয়েছে অজস্র গল্প, মিথ, গুপ্তধনের হাতছানি। এর মূল কারণ, এর আধেক রহস্য, আধেক দুর্বোধ্যতা। এখনও পেরুর অধিবাসীদের মধ্যে সুপ্ত বিশ্বাস রয়ে গিয়েছে, কোনও না-কোনও কুইপু সন্ধান দেবে ইনকা সাম্রাজ্যের বিপুল সম্পদের, যা স্পেনের ফ্রান্সিস্কো পিজ়ারোও লুঠ করে নিয়ে যেতে পারেনি… ইনকা সভ্যতা ধ্বংস করলেও ‘সেই’ কুইপুর সূত্র উদ্ধার করা হয়ে ওঠেনি আর তার। হয়তো তার মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে এল ডোরাডোর সত্যি হওয়ার চাবিকাঠি, কে বলতে পারে?

শ্রেয়া ঠাকুর