issue_cover
x

z কুকুরের জন্য স্মৃতিসৌধ

abdকুকুরকে মানুষের পরম বন্ধু বলা হয়ে থাকে। মানুষে-মানুষে ঝগড়া লাগে। কুকুররাও নিজেদের মধ্যে ঝগড়াঝাঁটি করে থাকে প্রায়ই। তবে কুকুরের ঝগড়ায় মানুষ তেমন নাক না গলালেও মানুষ যদি ঝামেলায় জড়ায়, তবে তার পুষ্যি কুকুর মোটেই হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকে না। নিজে স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে তো সে নিজের মালিককে রক্ষা করতে এগিয়ে আসেই, তায় মালিক যদি মুখ ফুটে একবার তার কাছে সাহায্য চেয়ে ফেলেন, তা হলে তো আর কথাই নেই। এযাবৎ ইতিহাসে মানুষে-মানুষে সবচেয়ে বড় যে দু’টি যুদ্ধ, তার প্রথমটিতেও (প্রথম বিশ্বযুদ্ধ) সেভাবেই মানুষকে সাহায্য করেছিল এয়ারডেল টেরিয়ার নামে এক বিশেষ প্রজাতির কুকুর। যুদ্ধে প্রাণ হারানো সৈনিকদের পাশাপাশি যাদের জন্য কিছু সৈনিকের প্রাণ বেঁচেছিল, সেই কুকুরদের অবদান মনে রেখে স্কটল্যান্ডে তৈরি হচ্ছে বিশাল এক স্মৃতিসৌধ। কুকুরদের যে এভাবে তালিম দিয়ে কাজে লাগানো যেতে পারে, সেকথা যিনি প্রথমবার বলেছিলেন এবং করেও দেখিয়েছিলেন, সেই লেফটেন্যান্ট কর্নেল এ়ডউইন রিচার্ডসন ছিলেন প্রথম ব্রিটিশ সারমেয় প্রশিক্ষণ শিবিরের প্রতিষ্ঠাতা। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে কীভাবে মানুষকে সাহায্য করেছিল এই কুকুররা? রীতিমতো গ্যাস মুখোশ পরে তারা তাদের পিঠের ব্যাগে করে খবরাখবর আদানপ্রদান করত। যুদ্ধক্ষেত্রে আহত হয়ে কাউকে প়ড়ে থাকতে দেখলে মুখে করে একটা টুপি কিংবা জুতো বা এক টুকরো কাপড় নিয়ে সেনা ছাউনিতে ফিরে আসত কুকুর। তাকে দেখে অফিসাররা বুঝতেন, এখনও যুদ্ধক্ষেত্রে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করছেন কোনও সৈনিক। অবিলম্বে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হত তাঁকে।

অচ্যুত দাস

ইনকাদের কথা বলা গিঁট- কুইপু


“ ‘হ্যাঁ, গাঁটপড়া রঙিন খানিকটা সাধারণ সুতলি?’ ঘনাদা আমাদের দিকে সকৌতুক অনুকম্পার সঙ্গে তাকিয়ে বললেন, ‘ওই সুতোর জট ক’টা পেলে, আমেরিকা এ পর্যন্ত সারা পৃথিবীতে যেখানে যত ধার দিয়েছে, সব শোধ করে দেওয়া যায়। শুধু ওই গাঁটপড়া সুতলি ক’টার জন্য গত সওয়া চারশো বছরে সওয়া চার হাজার মানুষ অন্তত প্রাণ দিয়েছে!’ ”
ঘনাদার ‘সুতো’ গল্প থেকে আমরা অনেকেই প্রথম ‘কিপু’ শব্দটা জানতে পারি, আর জানতে পারি প্রাচীন ইনকা সভ্যতার সঙ্গে তার গভীর যোগাযোগের কথা। ঘনাদার মুখের কথা কেড়ে নিলে বলতে হয়, “ইনকাদের কোনও লিখিত ভাষা ছিল না। তাঁরা যে ভাষায় কথা কইতেন তার নাম কেচুয়া (মতান্তরে কোয়েচুয়া)। প্রধান পুরোহিত তাঁর সংকেত-চিহ্ন তাই ভাষার অক্ষরে লিখে যাননি। তিনি সংকেতগুলি যাতে রেখে গিয়েছিলেন তাকে বলে কিপু।” কুইপু বা কিপু আদতে স্প্যানিশ শব্দ। এই শব্দটির আদি উচ্চারণ হল খিপু (khipu)এবং অর্থ হল গিঁট। এই শব্দটি ইনকাদের কুজ়কো শহরের আঞ্চলিক কোয়েচুয়া (Quechua) ভাষার শব্দ। এই ভাষার মহাপ্রাণ খ ধ্বনিটি অন্যান্য আঞ্চলিক ভাষায় ক হিসাবে উচ্চারিত হয়। এই বিচারে খিপু শব্দটি দাঁড়ায় কিপু, আরও অপভ্রংশ করলে কুইপু। কিন্তু এই কিপু বা কুইপু ব্যাপারটা আদতে কী?
কিপু বা কুইপু হল দক্ষিণ আমেরিকার ইনকা সভ্যতায় সংখ্যালিখন পদ্ধতি বিশেষ। প্রাচীন এই ইনকা সভ্যতার সাম্রাজ্য দক্ষিণ আমেরিকার ইকুয়েডর থেকে মধ্য চিলি পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। এর মূল শহর কুজকো (Cuzco) ছিল পেরুর দক্ষিণাঞ্চলের আন্দিজ পার্বত্য অঞ্চলে। যতটুকু জানা যায় ইনকা সভ্যতায় কোন অক্ষরভিত্তিক বা চিত্রভিত্তিক সংখ্যালিখন পদ্ধতি ছিল না। এরা সুতোতে গিঁট দিয়ে সংখ্যা নির্ধারণ বা গণন কার্য সম্পন্ন কর। এই গিঁটওয়ালা সুতোটিকে বলা হয়ে থাকে কুইপু। এই সভ্যতার সম্রাট থেকে সর্বসাধারণ এই লিখন পদ্ধতি ব্যবহার করত। এ পর্যন্ত বিভিন্ন জাদুঘর ও ব্যক্তিগত সংগ্রহে প্রায় ৬০০ কুইপুর সন্ধান পাওয়া গিয়েছে।
কিন্তু কুইপু দেখে গণনা করা হত কীভাবে?
এই পদ্ধতিতে একটা মূল সুতো থেকে আনুষঙ্গিক অনেকগুলো ছো়ট-ছোট সুতো ঝোলানো হত, এবং এই সুতোগুলোতে নির্দিষ্ট দূরত্ব অন্তর গিঁট দেওয়া হত। সুতো তৈরি করা হত আলপাকা বা লামার গায়ের রোম দিয়ে। সুতোর ধরন, গিঁটের সংখ্যা আর সুতোর রংয়ের উপর নির্ভর করে হিসেব কষা হত। সুতোর রং লাল হলে ধরে নেওয়া হত তা যুদ্ধকে নির্দেশ করছে, সুতোর রং যদি সাদা হত তবে তা শান্তি ও ধনলাভকে নির্দেশ করত। প্রতিটি একক গিঁটের মান ১০ করে বাড়তে থাকত। উচ্চমান যুক্ত গিঁটগুলো দেওয়া হত মূল সুতোর কাছে। আর সবচেয়ে নীচের গিঁটের মান হত একক মান বিশিষ্ট। অর্থাৎ মূল সুতোর কাছের গিঁটের মান যদি ১০০ হয় তবে একদম নীচের গিঁটের মান হবে ১০।
কুইপুর সামাজিক গুরুত্ব অসীম, জনসংখ্যা, মাস, বছর, কর সমস্ত কিছুই এর মাধ্যমে হিসেব করা যেত। এমনকী স্থানীয় জমি বণ্টন, সরকারি সিদ্ধান্ততেও কুইপুর প্রয়োজনীয়তা ছিল। পেরুতে যেসব নৃতত্ত্ববিদ ও প্রত্নতত্ত্ববিদেরা কুইপু নিয়ে কাজ করছেন তাঁরা জানিয়েছেন পেরুর দুটো অঞ্চলে এখনও প্রাচীন রীতি মেনে কুইপু ব্যবহার করা হয়, একটি San Andres de Tupicocha, আর-একটি San Cristobal de Rapaz।
কুইপু আদতে একটা রহস্যময় মজার জিনিস, তাকে ঘিরে রয়েছে অজস্র গল্প, মিথ, গুপ্তধনের হাতছানি। এর মূল কারণ, এর আধেক রহস্য, আধেক দুর্বোধ্যতা। এখনও পেরুর অধিবাসীদের মধ্যে সুপ্ত বিশ্বাস রয়ে গিয়েছে, কোনও না-কোনও কুইপু সন্ধান দেবে ইনকা সাম্রাজ্যের বিপুল সম্পদের, যা স্পেনের ফ্রান্সিস্কো পিজ়ারোও লুঠ করে নিয়ে যেতে পারেনি… ইনকা সভ্যতা ধ্বংস করলেও ‘সেই’ কুইপুর সূত্র উদ্ধার করা হয়ে ওঠেনি আর তার। হয়তো তার মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে এল ডোরাডোর সত্যি হওয়ার চাবিকাঠি, কে বলতে পারে?

শ্রেয়া ঠাকুর