issue_cover
x

z কৃষ্ণের মাখন না়ড়ুর রহস্য

jene-naobig-img01 পৃথিবীর বুকে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে কোনও কিছু ছুড়ে দিলে অভিকর্ষের টানে তা ফের নীচে নেমে আসে। ছোটবেলায় খেলার মাঠে বা পার্কে গিয়ে স্লিপে চড়েছ তো তোমরা সবাই? স্লিপ বেয়ে আমরা যে সুড়ুৎ করে একেবারে নীচে নেমে আসি, তার পিছনেও কারণ ওই অভিকর্ষ। কিন্তু যদি বলি, ছবিতে তামিলনা়ড়ুর মহাবলীপুরমের ওই যে বিশাল পাথরটা দেখতে পাচ্ছ, সেটাকে কোনওরকম আঠা দিয়ে জুড়ে না রাখা সত্ত্বেও সেটা ঢাল বেয়ে গড়িয়ে পড়েনি, তা হলে কি বিশ্বাস হবে? তোমাদের কেউ-কেউ হয়তো ভাববে, পাথরটা হয়তো ফাঁপা। এমন কিছুও ভারী নয়। নইলে কি আর খাড়াই বেয়ে ব্যাটা নেমে আসত না হুড়মুড় করে? কিন্তু পাথরটার ওজন মেপে দেখা গিয়েছে, সেটা প্রায় ২৫০ টনের কাছাকাছি! লম্বায় তিনি ২০ ফুট! চও়ড়ায় পাঁচ মিটার। অথচ খা়ড়াই ঢালের সঙ্গে এই এত্ত বড় পাথর মাত্র ৪ ফিট ছুঁয়ে আছে। এবং এইভাবে পাথরটা ওই ঢালে দাঁড়িয়ে আছে কতদিন ধরে? হিসেব করে দেখা গিয়েছে, পাথর ওখানে দাঁড়িয়ে আছে প্রায় ১২০০ বছর ধরে। এর মধ্যে পল্লব রাজা নরসিংহবর্মন নাকি একবার পাথরটি স্থানচ্যুত করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছেন। পাথরটা কোনওভাবে গ়ড়িয়ে নীচের শহরের উপর দিয়ে চলে গেলে কতখানি ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে, সেই ভেবে ১৯০৮ সালে এক ইংরেজ গভর্নরও ভয় পেয়েছিলেন। শোনা যায়, সাত-সাতখানা হাতি এনে গভর্নর চেষ্টা করেছিলেন পাথরটিকে নিরাপদে অন্যত্র সরানোর। কিন্তু গোঁ ধরে থাকা পাথরকে সরানো যায়নি একচুলও। এমন আশ্চর্য পাথরকে ওভাবে ওখানে কে বানাল, কবে বানাল, কীভাবেই বা বানাল, এর মীমাংসা করতে গিয়ে স্থানীয় মানুষদের অনেকে বিশ্বাস করে ফেলেছেন, এ নিশ্চয়ই দেবতাদের খামখেয়ালিপনা। আর যাঁরা বিজ্ঞানে বিশ্বাসী, তাঁরা অঙ্কটঙ্ক কষে বলেছেন, পাথরের অমন অবস্থান ভীষণ আশ্চর্যজনক ঠিকই, তবে নীচের খাড়াই ঢালের সঙ্গে পাথরের ঘর্ষণ, পাথরের ভরকেন্দ্রের অবস্থান ইত্যাদির কথা ভাবলে পাথরের ওখানে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা একেবারে অসম্ভব কিছুও নয়। আর পাথরটা ওখানে ওভাবে বসিয়ে গেল কে? বিজ্ঞান বলছে, কয়েকশো বছর ধরে বাতাস ক্ষইয়ে দিয়েছে নীচের খাড়াই ঢাল আর উপরের ওই পাথরকে। ফলে, পুরো ব্যাপারটাই প্রাকৃতিক। পাথরটাকে সারা বিশ্ব যতই ‘ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মাখনের নাড়ু’ নাম দিয়ে থাকুক না কেন, এর মধ্যে অলৌকিক কিচ্ছুটি নেই।

মানুষের তৈরি বিস্ময়ের নাম ‘নোত্র দাম’

ক’দিন আগে আগুন লেগে প্রায় সম্পূর্ণ ভস্মীভূত হয়ে গিয়েছে প্যারিসের নোত্র দাম ক্যাথিড্রাল চার্চ। মধ্যযুগে সারা বিশ্বে গথিক রীতিতে তৈরি ক্যাথিড্রালগুলোর মধ্যে আকার-আয়তন এবং নির্মাণশৈলীর দিক থেকে এটিই সবচেয়ে বিখ্যাত। ঐতিহাসিক দিক থেকেও এই চার্চের অবস্থান উল্লেখযোগ্য, কারণ নোত্র দাম তৈরি হয়েছিল অতীতে সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা দু’টি চার্চের ধ্বংসস্তূপের উপরেই। আর তারও আগে সেখানে ছিল রোমান দেবতা জুপিটারের মন্দির। ওই যে দু’টি চার্চের কথা বললাম, তাদের ধ্বংসাবশেষের উপরেই একটি বড় চার্চ তৈরি করার ভাবনা ১১৬০ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ প্রথমবার মাথায় এসেছিল প্যারিসের বিশপ ময়িস দি সুলি-র মাথায়। সেই অনুযায়ী ১১৬৩ সালে পোপ আলেকজ়ান্ডার তৃতীয়-র হাতে নোত্র দামের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়। পরবর্তী কয়েকশো বছর ধরে একটু-একটু করে নোত্র দামের বিশালত্ব ও অভিনবত্ব বাড়তেই থাকে আর সেইসঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকে নোত্র দামকে ঘিরে মানুষের মুগ্ধতা! বহু শতকের ইতিহাসে নোত্র দামের ছোট-বড় ক্ষয়ক্ষতিও হয়েছে একাধিকবার। ফরাসি বিপ্লবের পর এই ক্যাথিড্রালকে ধ্বংস হয়ে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা করেছিলেন নেপোলিয়ন বোনাপার্ট। ১৮০৪ সালে নেপোলিয়ন এই নোত্র দামে দাঁড়িয়েই নিজেকে ফরাসি সম্রাট হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন।
উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে ফরাসি স্থপতি ইউজিন ইমানুয়েল ভিওলে লে ডিউক-এর হাতে নোত্র দামের ঢালাও পুনর্নির্মাণ হয়। এই প্রসঙ্গে একটা বইয়ের নাম না করলেই নয়। ১৮৩১ সালে ভিক্টর হুগো নামে এক ফরাসি সাহিত্যিক ‘নোত্র দাম দি প্যারিস’ নামে একটি ঐতিহাসিক উপন্যাস লিখলেন, যার পটভূমিকায় ছিল নোত্র দাম ক্যাথিড্রাল। এই উপন্যাসের ব্যাপক জনপ্রিয়তাই উনিশ শতকে নোত্র দামের সৌন্দর্য বর্ধনের পিছনে অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছিল বলে শোনা যায়। আগুন লেগে ৮০০ বছরের প্রাচীন এই চার্চ এতটাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে যে, তাকে আবার তার আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া প্রায় অসম্ভব। কিন্তু মানুষের ইতিহাস যতদিন এই পৃথিবীর বুকে লেখা থাকবে, তাতে জ্বলজ্বল করবে নোত্র দাম-এর বিশালত্ব ও চোখধাঁধানো স্থাপত্যরীতির বিবরণ!