issue_cover
x
লালটেম
শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়


লালটেম কারো পরোয়া করে না। সে আছে বেশ। সকালবেলা সে তিনটে মোষ নিয়ে চরাতে বেরোয়। এ জায়গাটা ভারী সুন্দর। একদিকে বেঁটে-বেঁটে চা-বাগানের দিগন্ত পর্যন্ত বিস্তার। অন্য ধারে বড় একটা মাঠ। মাঠের শেষে তিরতিরে একটা ঠান্ডা জলের পাহাড়ী নদী— তাতে সব সময়ে নুড়ি-পাথর গড়িয়ে চলে। নদীর ওপারে জঙ্গল। আর তার পরেই থমথম করে আকাশ-তক উঠে গেছে পাহাড়। সামনের পাহাড়গুলো কালচে সবুজ। দূরের পাহাড়গুলোর শুধু চূড়ার দিকটা দেখা যায়— সেগুলো সকালে সোনারঙের দেখায়, দুপুরে ঝকঝকে সাদা, আর সন্ধের মুখে মুখে ব্রোঞ্জের মতো কালোয় সোনায় রঙ ধরে থাকে। আর চারপাশে সারাদিন মেঘ বৃষ্টি রোদ আর হাওয়ার খেলা। গাছে-গাছে পাখি ডাকে, কাঠবেড়ালি গাছ বায়, নদীর ওপাশে সরল চোখের হরিণ অবাক হয়ে চারদিক দেখতে দেখতে আর থমকে-থমকে থেমে জল খেতে আসে।
লালটেম বেশ আছে। মোষ নিয়ে সে মাঠে নিয়ে গিয়ে ছেড়ে দেয়। এক জায়গায় বসে কোঁচড় থেকে মুড়ি খায়। নদীর জল খায়। তারপর খেলা করে। তার সঙ্গী-সাথী কিছু কম নেই। তারাও সব মোষ গরু বা ছাগল চরাতে আসে। যে যার জীবজন্তু মাঠে ছেড়ে দিয়ে চোর-চোর খেলে, ডান্ডাগুলি খেলে, নদীতে নেমে সাঁতরায়, আরো কত কী করে।
দুপুরের দিকে খুব খিদে পেলে বাড়ি ফিরে লালটেম খায়। কিন্তু সব দিন খাবার থাকে না। যেদিন থাকে না সেদিন লালটেম টের পায়। তাই সেদিন সে বা়ড়ি ফেরে না। দুপুরে সে গাছের পাকা ডুমুর কি আমলকী পেড়ে খায়। বেলের সময় বেল পাড়ে, কখনো বা টক আম বা বাতাবী লেবু পেয়ে যায় বছরের বিভিন্ন সময়ে। তাই খায়। খেয়ে সবচেয়ে বুড়ো আর শক্ত চেহারার মোষ মহারাজার পিঠে উঠে চিৎপাত হয়ে ঘুমোয়।
ছোট্টো ইস্টিশনটার গা ঘেঁষে লালটেমদের ঝোপড়া। তার বাবা পেতলের থালায় সাজিয়ে পেঁড়া বিক্রি করে ট্রেনের সময়ে। বাজারে বড়-বড় কারবারীদের কাছে ভৈঁসা ঘি বেচে, দুধ দেয় বাড়ি-বাড়ি। তিনটে মোষের মধ্যে দুটো হচ্ছে মেয়ে মোষ। মহারাজা পুরুষ। দুটো মেয়ে-মোষই বছরের কোনো-না-কোনো সময়ে দুধ দেয়। বুড়ো মোষটার মরার সময় ঘনিয়ে এসেছে। আর দুটোও বুড়ো হতে চলল। সামনে দুর্দিন। লালটেমদের সংসার বেশ বড়। মা ঘুঁটে দিয়ে বিক্রি করে, বাবা দুধ, পেঁড়া, ঘি বেচে। এই করে কোনোরকমে দশ জনের সংসার চলে। লালটেমের দাদু আছে, আরো ছয় ভাই-বোন আছে! তারা কোনো লেখাপড়া শেখেনি, মাঝে-মাঝে মোষের দুধ, ঘি, বা পেঁড়া ছাড়া কোনো ভাল খাবার খায়নি, খাটো ধুতি বা শাড়ি ছাড়া ভাল জামাকাপড় পরেনি, তারা একসঙ্গে একশো টাকাও কখনো চোখে দেখেনি। তবু লালটেম কারো পরোয়া করে না। দিনভর সে মোষ চরায়, সাথীদের সঙ্গে খেলা করে, আর চারদিককার আকাশ বাতাস আলো পাহাড় দেখে চমৎকার সময় কেটে যায়।
একদিন একটা রোগা মানুষ ওপার থেকে শীতের নদীর হাঁটুভর জল হেঁটে পার হয়ে এল। লোকটার গা ময়লা চাদরে ঢাকা, পরনে একটা পাজামা, কাঁধে মস্ত এক পুঁটুলি। লালটেম আর তার সাথীরা অবাক হয়ে লোকটাকে দেখছিল। কারণ, নদীর ওপারের জঙ্গলে বাঘ আছে, বুনো মোষ, দাঁতাল শুয়োর আর গন্ডার আছে, সাপ তো কিলবিল করছে। ওদিকে কেউ যায় না, একমাত্র কাঠুরেরা ছা়ড়া। তারাও আবার দল বেঁধে যায়, সঙ্গে লাঠি থাকে, বল্লম থাকে, তীর ধনুক থাকে, আর কুড়ুল তো আছেই।
লোকটা জল থেকে উঠেই পোঁটলাটা মাটিতে রেখে একগাল হেসে বলল, ‘‘একটা জিনিস দেখবে?’’
‘‘হ্যাঁ-আ্যা,’’ লালটেমরা খুব রাজী।
লোকটা ধীরে আস্তে পুঁটুলির গিঁট খুলে চাদরটা মেলে দিল। লালটেমরা অবাক হয়ে গেল দেখে, ভিতরে কয়েকটা ইঁট।
তারা সমস্বরে বলে ওঠে, ‘‘ ও তো ইঁট!’’
রোগা লোকটা হেসে বলল, ‘‘ইঁট ঠিকই তবে সাধারণ ইঁট নয়।প্রায় দেড় হাজার বছরের পুরনো একটা রাজবাড়ির জিনিস। ঐ জঙ্গলের মধ্যে আমি সেই রাজবাড়ির খোঁজ পেয়েছি।’’
রাজা বা রাজবাড়ি সম্পর্কে লালটেমের ধারণা খুব স্পষ্ট নয়, তবে সে জানে, একজন রাজা সোনার রুটি খেতেন। তাঁর রানী যে শাড়ি পরতেন, সেটা জ্যোৎস্নার সুতো দিয়ে বোনা।
লোকটা ইঁটগুলোকে পুঁটুলিতে বেঁধে হাত ঝেড়ে বলল, ‘‘সেই রাজবাড়িটায় অনেক কিছু মাটির নীচে পোঁতা আছে। যে পাবে সে এক লাফে বড়লোক হয়ে যাবে। তবে কিনা সেখানে যখেরা পাহারা দেয়, সাপ ফণা ধরে আছে চারিদিকে। যাওয়া শক্ত।’’
লালটেম বলে, ‘‘তুমি তাহলে বড়লোক হলে না কেন?’’
লোকটা অবাক হয়ে বলে, ‘‘আমি! আমি বড়লোক হয়ে কী করব? দুনিয়াতে আমার কেউ নেই। দিব্যি আছি, ঘুরে ঘুরে সময় কেটে যায়। রাজবাড়িটা দেখতে পেয়ে আমি শুধু লোককে দেখানোর জন্য কয়েকটা ইঁট কুড়িয়ে এনেছি। এইতেই আমার আনন্দ।’’
লালটেম বলে, ‘‘তোমাকে বাঘে ধরল না? সাপে কাটল না? বুনো মোষ তাড়া করল না?’’
লোকটা ভালমানুষের মত বলে, ‘‘জানোয়াররাও বন্ধু আর শত্রু চিনতে পারে। আমি নিরীহ মানুষ, ওরাও সেটা টের পেয়ে-ছিল। তাই কিছু বলেনি।’’
লোকটা তারপর গান গাইতে গাইতে মাঠ পেরিয়ে চলে গেল। লালটেম তার সাথীদের সঙ্গে খেলায় মেতে গেল।
পরদিন ভোরবেলায় কোদাল গাঁইতি হাতে কয়েকজন লোক নদীর ধারে এসে হাজির। তাদের মধ্যে একজন লোককে লালটেম চেনে। সে হল এ অঞ্চলের নামকরা গুন্ডা আর জুয়াড়ি প্রাণধর। লালটেমকে ডেকে সে লোকটা বলল, ‘‘এই ছোঁড়া, ঐ জঙ্গলের মধ্যে যাওয়ার রাস্তা আছে?’’
লালটেম ভালমানুষের মতো বলে, ‘‘কাঠুরেদের পায়ে-হাঁটা রাস্তা আছে।’’
লোকটা কটমট করে চেয়ে বলে, ‘‘আমরা যে এদিকে এসেছি, খবরদার কাউকে বলবি না!’’
লোকগুলো হেঁটে শীতের নদী পার হয়ে ওপাশে জঙ্গলের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেল।

লালটেমরা মুখ তাকাতাকি করে নিজেদের মধ্যে খেলা শুরু করে দেয়। কিন্তু একটু বাদেই আবার কোদাল-শাবল হাতে একদল লোক আসে। তারাও জঙ্গলের মধ্যে পথ আছে কিনা জিজ্ঞেস করে তারপর লালটেমরা যাতে আর কাউকে না বলে সে বিষয়ে সাবধান করে দিয়ে নদী পার হয়ে জঙ্গলে ঢুকে পড়ে।

সারাদিন যে এভাবে কত লোক জঙ্গলের মধ্যে গেল তার গোনাগুনতি নেই। তাদের মধ্যে কানা খোঁড়া, বুড়ো কচি বড়লোক গরিব সবরকম আছে। চোরের মতো হাবভাব সবার। কী যেন গোপন করছে। এদের দলে লালটেম নিজের বাবাকেও দেখে ভারী অবাক হয়।

বাবা লালটেমকে দেখে কিছু অপ্রস্তুত হয়ে বলল, ‘‘আমার ফিরতে দুদিন দেরি হবে। সাবধানে থেকো। মোষগুলোকে যত্নে রেখো। বাড়ি বাড়ি দুধ দিও, পেঁড়া বেচো, ঘি বিক্রি কোরো। ’’
বাবা গেল। কিছুক্ষণ পরে একদল ঘুঁটেউলির সঙ্গে মাকেও জঙ্গলে যেতে দে্খল লালটেম।
মা কাছে এসে তাকে টেনে নিয়ে বলল, ‘‘আমার ফিরতে একটু দেরি হবে বাবা। একদিন বা দুদিন। তুমি সব সামলে রেখো।’’
সেই রোগা লোকটা গ্রামে-গঞ্জে হাটে-বাজারে রাজবাড়ির কথা রটিয়ে দিয়ে গেছে। এখন তাই লোভী মানুষেরা চলে‌ছে। সেই রাজবাড়ির খোঁজে। লালটেম তা‌ই অবাক হলেও ব্যাপারটা বুঝতে পারল।
দুদিন গেল। তিনদিন গেল। লালটেম আর তার সাথীরা রোজ মোষ চরাতে আসে। এসে নদীর ধারে দাঁড়িয়ে ওপারে জঙ্গলের দিকে চেয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। সকলেরই বাপ, মা আপন-জনেরা জঙ্গলে গেছে। কেউই এখনো ফেরেনি।
দাঁড়িয়ে তারা একটু অপেক্ষা করে। তারপর আবার খেলায় মাতে। নদীতে স্নান করে। গাছে উঠে খাওয়ার যোগ্য ফলপাকুর খোঁজে। মোষের পিঠে শুয়ে থাকে।
চারদিনের দিন সন্ধেবেলা একটা লোক জঙ্গল থেকে টলতে টলতে বেরিয়ে ঝপাং করে নদীতে পড়ল। পড়ে আর ওঠে না। লালটেমরা দৌড়ে গিয়ে জল থেকে টেনে তুলে তাকে এপারে নিয়ে আসে।
লোকটা প্রাণধরের এক স্যাঙাত। তার চোখ রক্তবর্ণ, পেটে পিঠে এক হয়ে গেছে খিদেয়, ভাল করে কথা বলতে পারছে না। লালটেম গিয়ে শালপাতায় নদীর জল তুলে এনে তাকে খাওয়ায়। তারপর মকাই ভাজা দেয়।
লোকটা একটু দম পেয়ে বলল, ‘‘সব মিথ্যে কথা। রাজবাড়ি কোথাও নেই। আমরা মাইলের পর মাইল হেঁটে খুঁজেছি। খাবার নেই, জল নেই। সারা পথে নানারকম বিপদ। আমার সঙ্গীরা কোথায় হারিয়ে গেছে।’’
এইরকম ভাবে দু চার-দিন পরে পরে একটি-দুটি হা-ক্লান্ত লোক ফিরে এসে তাদের বিপদের কথা জানায়। তারা মিথ্যে মিথ্যে হয়রান হয়েছে। বহু লোক বাঘের পেটে গেছে। কিছু মরেছে বুনো হাতি, বুনো মোষ, দাঁতাল শুয়োরের পাল্লায় পড়ে। বহু লোককে সাপে কেটেছে। জঙ্গলে খাবার নেই জল নেই, পথ নেই। সেখানে গোলকধাঁধার মতো ঘুরে মরতে হয়।
গা – ভর্তি জ্বর নিয়ে একদিন লালটেমের বাবা ফেরে। শরীর শুকিয়ে সিকিভাগ হয়ে গেছে। তার ওপর বিড়বিড় বকছে- ‘‘রাজবাড়ি! সোনা-দানা! বাপ রে বাপ!’’
এর দুদিন বাদে ফিরল মা। লালটেম দেখল, তার মা এ কয়েকদিনেই খুনখুনে বুড়ি হয়ে গেছে। মাজা বেঁকে যাওয়ায় লাঠিতে ভর দিয়ে কুজোঁ হয়ে হাঁটে, মাথার চুল পেকে শনের গুছি, গলার স্বরে একটা কাঁপ ধরেছে।
শেষ পর্যন্ত দেখা যায়, একে-একে সবাই ফিরে এসেছে। মরেনি কেউই। তবে সকলেরই ভীষণ বিপদ হয়েছিল। নানারকম বিপদ আর কষ্ট সহ্য করে মরতে মরতে ফিরতে হয়েছে। তবে মানুষগুলো আর আগের মতো নেই। যুবকেরা বুড়ো হয়ে ফিরেছে, বুড়োরা অর্থব হয়ে গেছে, আমুদে লোকেরা দুঃখী, দুঃখীরা পাথর হয়ে এসেছে। কোনো মানুষই আর আগের মতো নেই।
লালটেম আজকাল মোষ চরাতে চরাতে খুব রাজবাড়ির কথা ভাবে। তার খুব জানতে ইচ্ছে করে রাজবাড়ির জন্য লোকগুলো হন্যে হয়ে ছুটে গিয়েছিল কেন!
দুপুর গড়িয়ে গেছে। মোষ মহারাজার পিঠে গামছা পেতে চিত হয়ে শুয়ে ঘুমিয়ে ছিল লালটেম। বুড়ো মোষটা ঘাস খেতে খেতে নদীর ধারে এল। তারপর লালটেমকে পিঠে নিয়ে নদীতে নামল জল খেতে। জল খেয়ে খুব ধীরে ধীরে নদী পেরিয়ে জঙ্গলের দিকে চলতে লাগল।
লালটেম ঘুম থেকে উঠে হাঁ। এ সে কোথায়? মহারাজা তাকে পিঠে নিয়ে গভীর জঙ্গলের ভিতরে দাঁড়িয়ে আছে। দুপুর শেষ হয়ে রোদে বিকেলের নরম আভা লেগেছে। চারদিকে গভীর স্বরে পাখিরা ডাকছে। পাতা খসে পড়ছে গাছ থেকে।সরসর করে হাওয়া দিচ্ছে। আর চিকড়ি-মিকড়ি আলোছায়ায় সামনেই এক বিশাল বাড়ির ধ্বংসস্তুপ। ভেঙে পড়া খিলান, গম্বুজ, পাথরের পরী, ফোয়ারা, শ্বেতপাথরের সিঁড়ি। বাড়ির চুড়ায় এখনো একটা সোনার কলস চিকমিক করছে।
লালটেম হাঁ করে চেয়ে আছে তো আছেই। মহারাজা ফোঁস করে একটা শ্বাস ছাড়তে সেই শব্দে লালটেম সচকিত হয়ে মাটিতে নামল লাফ দিয়ে। তাই তো! এই তো সেই রাজবাড়ি মনে হচ্ছে। এক পা দু পা করে লালটেম এগোয়।
চারদিকে শ্যাওলা ধরা পাথর আর ইঁটের স্তূপ। এই সেই ইঁট, যা রোগা লোকটা তাদের দেখিয়েছিল। সুতরাং এইটাই রাজবাড়ি। লালটেম দেখে, চারধারে নানা রঙের সাপ ঘুরে বে়ড়াচ্ছে। কিছু সাপ ফণা তুলছে। ফোঁ ফোঁ করে ভয়ংকর শব্দ করছে তারা। কোত্থেকে একটা দুটো তক্ষক ডাকল। ছমছম করে ওঠে এখানকার নির্জনতা। লালটেম ভয় পায় বটে, কিন্তু তবু এগোয়। সাপেরা তার পথ থেকে সরে সরে যায়।
চারদিকে ফিসফাস শব্দ ওঠে। কারা যেন হিঃ হিঃ করে হেসে ওঠে কাছেই। চারদিকে চেয়ে লালটেম কাউকে দেখতে পায় না। আবার এগোয়।
কী করুণ অবস্থা! বিশাল ঘরের আধখানা ভেঙে পড়ে গেছে, বাকি অর্ধেকটায় ধুলো জঞ্জাল আর আগাছা। মাকড়শার জাল এত ধারালো যে গায়ে লাগলে চামড়া চিড়ে যায়। কাঁকড়া – বিছেরা বাসা করে আছে যেখানে সেখানে, একটা ঘরে শেয়ালের বাচ্চারা দলা পাকিয়ে ঘুমোচ্ছে, একটা জংধরা লোহার সিন্দুকের ওপর নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছে একটা দাঁতাল শুয়োর।
একটার পর একটা ভাঙা ঘর পার হয় লালটেম। দেখে, অনেকগুলো বন্ধ কুঠুরি। কৌতূহলবশে সে একটা কুঠুরির দরজা ঠেলা দিতেই দরজাটা মড়াত করে ভেঙে প়ড়ে গেল। লালটেম ভিতরে ঢুকে ভীষণ অবাক হয়ে দেখে, সেখানে অনেক সোনা-রুপোর বাসন পাঁজা করে রাখা।
পাশের কুঠুরিতে ঢুকে লালটেম হাজার হাজার মোহর দেখতে পেল। তার পাশেরটার গয়নায়, হীরে, মুক্তো।
কত কী রয়েছে রাজবাড়িতে। দেখে লালটেম অবাক তো অবাক। সব কিছু সে ছুঁয়ে ছুঁয়ে নেড়েচেড়ে দেখে, তারপর আবার যেখানকার জিনিস সেখানেই রেখে দেয়।
সাতটা কুঠুরির সব শেষটায় ঢুকে লালটেম দেখে ধুলোর ওপর উপুড় হয়ে পড়ে আছে একটা মানুষের কঙ্কাল। ভীষণ ভয় পেয়ে লালটেম দরজার দিকে পিছু হটে সরে এল।
হঠাৎ কঙ্কালটা নড়ে উঠল। একটা দীর্ঘশ্বাসের শব্দ করে কঙ্কালটা বলল, ‘‘লালটেম, যেও না।’’
লালটেম ভয় পেয়েও দাঁড়ায়।
এক বোঝা হাড় নিয়ে খটমট শব্দ করে আস্তে আস্তে কঙ্কালটা উঠে বসে। লালটেম দেখে কঙ্কালটার পাঁজরের মধ্যে একটা কালো সাপ, মাথার খুলির ভিতর থেকে চোখ আর নাকের ফুটো দিয়ে কাঁকড়া বিছে বেরিয়ে আসছে আর সারা গায়ে লাল পিঁপড়ে থিক থিক করছে।
কঙ্কালটা হাত তুলে বলে, ‘‘ আমার দশা দেখেছ?’’
‘‘দেখছি।’’
‘‘ভয় পেও না। এখানে যা কিছু দেখছ, সব সোনাদানা মোহর, গয়না, এ সবই তোমার। নিয়ে যাও।’’
লালটেম মাথা নেড়ে বলে, ‘‘নিয়ে কী হবে?’’
‘‘অভাব থাকবে না। খুব বড়লোক হয়ে যাবে। নাও।’’
বাইরে থেকে গম্ভীর গলায় মহারাজা ডাকল ‘হাংগা’।
লালটেম চমকে উঠে বলল, ‘‘আমার মোষটার জলতেষ্টা পেয়েছে। আমি যাই।’’
‘‘তোমার মোষগুলো বুড়ো হয়েছে লালটেম, একদিন মরবে। তখন বড় দুর্দিন হবে তোমাদের। এইবেলা বড়লোক হয়ে যাও।’’
মহারাজা বাইরে ভীষণ দাপিয়ে চেঁচায় ‘গাঁ…. গাঁ…..।’
লালটেম একটু হেসে বলে, ‘‘আমার দিন খারাপ যায় না। বেশ আছি।’’
কঙ্কালটা রেগে গিয়ে বলে, ‘‘গাঁ গঞ্জের হাজারো মানুষ যে রাজবাড়ি খুঁজে খুঁজে হয়রান, সেই রাজবাড়ি পেয়েও তুমি বড়লোক হবে না?’’
লালটেম একটু ভেবে বলে, ‘‘নাঃ আমি তো বেশ আছি। চারদিকে কত আনন্দ! কত স্ফূর্তি!’’
সাপটা ফোঁস করে কঙ্কালটার পাঁজরায় একটা ছোবল দিল। উঃ করে কঙ্কালটা পাঁজর চেপে ধরে বলল, ‘‘গত একশ বছর ধরে রোজ ছোবলাচ্ছে রে বাপ। … ইঃ, ঐ দেখ মাথায় ফের কাঁকড়াবিছেটা হূল দিল…. কী যন্ত্রণা!… আচ্ছা লালটেম, বলো তো বোকা লোকগুলো রাজবাড়িটা খুঁজে পায় না কেন? তোমাদের এত কাছে, জঙ্গলের প্রায় ধার ঘেঁষেই তো রয়েছে, তবু, খুঁজে পায় না কেন? আর যে দু-একজন খুঁজে পায় সেগুলো একদম তোমার মতোই আহাম্মক। লালটেম্, লক্ষ্মী ছেলে যদি একটা মোহরও দয়া করে নাও, তবে আমি মুক্তি পেয়ে যাই। নেবে?’’
বাইরে মহারাজা ভীষণ রেগে চেঁচায় – ‘‘গাঁ-আঁ।
লালটেম মুখ ঘুরিয়ে নেয়। বলে, ‘‘নিলেই তো তোমার মতো দশা হবে।’’
এই বলে লালটেম বেরিয়ে আসে গটগট করে। মহারাজা তাকে দেখে খুশি হয়ে কান লটপট করে, গাঁ শোঁকে, পা দাপিয়ে আনন্দ জানায়।
পরদিন থেকে আবার লালটেম মোষ চরাতে যায়। সাথীদের সঙ্গে খেলে। পাহাড়, জঙ্গল, নদী, মাঠ, চা- বাগান দেখে তার ভারী আনন্দ হয়। রোদ আর আলো, মেঘ আর বৃষ্টি, বাতাস আর দিগন্ত তাকে কত আদর জানায় নানাভাবে।
কোনোদিন তার খাবার থাকে। কোনোদিন থাকে না। যেদিন খাবার জোটে না, সেদিন সে মহারাজার পিঠে শুয়ে শুয়ে আকাশ দেখে। তার মনে হয়স সে বেশ আছে। খুব ভাল আছে। তার কোনো দুঃখ নেই।

ছবি- বিমল দাশ
———————————————————
তৃতীয় বর্ষ, অষ্টম সংখ্যা, অগ্রহায়ণ, ১৩৮৪ সাল (নভেম্বর, ১৯৭৭)। বানান অপরিবর্তিত রাখা হল।