issue_cover
x
হরিণের কান্না
অমরেন্দ্র চক্রবর্তী

দুপুরের নীচে সমস্ত নদীটা দেখাচ্ছে যেন হাজার-হাজার হীরে-বসানো বিরাট একটা অলংকার। লঞ্চে চলেছি, মাথার ওপর চিল ডাকছে ঠিকই, কিন্তু লঞ্চের ভট-ভট শব্দে স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছি না। মাঝে-মাঝে ছোঁ মেরে জল থেকে মাছ তুলে নিয়ে দূরে উড়ে যাচ্ছে দেখতে পাই। আরও দূরে, আকাশের অনেক উঁচুতে তিন-চারটে চিল মানুষের হাই তোলার ভঙ্গির মতন আলতোভাবে ভেসে রয়েছে।
কী-একটা গ্রামের ঘাট দেখা যেতেই লঞ্চটা মাঝ-নদী ছেড়ে একটু একটু করে ডাঙার দিকে বেঁকতে লাগল। গাছের গুঁড়ি পাশাপাশি পেতে ঘাট বানানো হয়েছে, লঞ্চটা ঘাটের কাছে এসে থাকম। অল্পবয়সী একটা ছেলে লম্বা একফালি তক্তা দিয়ে লঞ্চের গা থেকে ঘাট পর্যন্ত জুড়ে দিতেই যারা এতক্ষণ নামবার জন্যে উদ্গ্রীব হয়ে ছিল তারা হুড়মুড় করে নেমে গেল। নিজের গ্রামের কাছে এসে মানুষ কতক্ষণ আর গ্রামের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে।
ঘাটের কাছে ডাঙায় ছোট একদল মানুষ দাঁড়িয়ে ছিল, আমি ভেবেছিলুম, ওরা এখান থেকে লঞ্চে উঠবে, বা হয়তো এদেরই আত্মীয়-টাত্মীয় আসছে বলে আগে থেকে এসে ঘাটে দাঁড়িয়েছে। দেখলুম তা তো নয়, ওরা যেমন দাঁড়িয়ে ছিল, তেমনই দাঁড়িয়ে রইল লঞ্চটার দিকে চেয়ে। ওরা বোধহয় গ্রামের ঘাটে লঞ্চ এলে শুধু দেখতে আসে। রোজ-রোজ ওরা কী দেখে আমি ভেবে পেলুম না। লোকগুলোর পাশেই, ওদেরই মতন, মাথায় শুধু অনেকটা ঢ্যাঙা, একদল গাছও নদীর দিকে দেখছে। লঞ্চে বসে গা-ঘেঁষাঘেঁষি গাছগুলোর দিকে চেয়ে দেখি ওদের ডালে-পাতায় এলোমেলো চৈত্রমাস খেলা করছে। কত রকম শব্দ সেই খেলার-কখনও টানা শো-শো, কখনও ভাঙা-ভাঙা ঝিরিঝিরি, কখনও বা একঝাঁক পায়রা উঠোনের ধান খেতে খেতে আচমকা তাড়া খেয়ে ডানা ঝটপট করতে করতে উড়ে গেলে যে রকম শোনায়, তেমনি।
নদীর অলংকার চিরে লঞ্চ এগিয়ে চলল। দূর থেকে আমি পিছনে চেয়ে দেখলাম ঘাটের সেই দাঁড়িয়ে থাকা মানুষজন চলে গেছে, আর পাশের গাছগুলো আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে তেমনি দাঁঢ়িয়ে আছে। আমি বরাবরই দেখেছি গাছেরা কোথাও যায় না, নিজেদের আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-পড়শি, বন্ধু-বান্ধব, সন্তান-সন্ততি নিয়ে শুধু একজায়গায় দাঁড়িয়েই থাকে, আর কোন দূরের পূবদিক থেকে তাদের কাছে এসে ডালপালায় আলো মাখিয়ে দিয়ে যায় ভোর বেলা, পশ্চিম দিক থেকে সূর্যাস্ত এসে তাদের ছুঁয়ে থাকে আর কত দূরের মাঠ নদী সমুদ্র পাহাড় থেকে ছুটে এসে হাওয়া তাদের সঙ্গে খেলা করে।
নদীর দু পাশে গ্রামের পর গ্রাম ফেলে এগিয়ে যাচ্ছি সুন্দরবনের দিকে। মস্ত বড় রাঙা টিপের মতন স্নিগ্ধ হয়ে সূর্য আকাশের কিনারে নেমে জল ছুঁয়ে ভেসে রয়েছে। সমস্ত নদী জুড়ে রঙের আলপনা হাওয়ায় মোমবাতির শিখার মতন তিরতির করছে। দেখতে দেখতে চলেছি, হঠাৎ সামনের একটা গ্রাম থেকে কোলাহল ভেসে এসে আমার চোখের দেখা ভেঙে দিল। লঞ্চ যতই গ্রামের একটু ভেতরের দিকের মাঠে অনেক লোক মিলে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে একটা হরিণ ধরবার চেষ্টা করছে। ভয়ে দিশেহারা হরিণটা বেষ্টনীর ফাঁক-ফোঁকর খুঁজে যতই এদিক-ওধিক ছুটোছুটি করছে, লোকেরাও ততই রে-রে শব্দে তাকে তাড়া করে-করে কোণঠাসা করে ফেলছে। বিকেল আর সন্ধের মাঝামাঝি সময়টা বড় বেশি দয়া ও করুণাভরা, মাঠে তখনও সেই করুণার রং শুকোতে-দেওয়া কাপড়ের মতন স্পষ্ট লেগে রয়েছে, তার মধ্যে একটা হরিণের ভয় পেয়ে ছুটোছুটি করা দেখে আমার বুকের মধ্যে টনটন করে উঠল। এমনিতেই হরিণের, আর মেঘলা আকাশের নীচে গোরুর চোখ দেখে কার না মায়া হয়!

নামবার কথা ছিল না, আমি তবু ওই গ্রামেই নেমে পড়লুম। লোকগুলো ততক্ষণ হরিণটাকে ধরে ফেলেছে, একজন তার কোমরের গামছা দিয়ে হরিণটাকে বাঁধছে, অন্যরা তার আশ্চর্য শিং দুটো আর ঠ্যাং ধরে রেখেছে।
আমি লোকগুলোর কাছে গিয়ে বললাম, ‘‘আমি তোমাদের মিনতি করছি, হরিণটাকে তোমরা ছেড়ে দাও।’’
যে লোকটা বাঁধছিল, সে হরিণের শিঙের গোড়ার বাঁধন শক্ত করতে-করতে বলল, ‘‘আমি এটাকে নদীর ওপার থেকে ধরে নৌকোয় করে এতটা টেনে এনেছি ছেড়ে দেবার জন্যে নয়। ব্যাটা দিব্যি আসছিল, ডাঙায় পা দিয়েই দড়ি ছিঁড়ে দে ছুট! তা, তুমি কে বটে?’’
আমি বললুম, ‘‘আমি একজন সামান্য লোক, ঘুরতে ভালো লাগে, তাই ঘুরে বেড়াই। তুমি হরিণকে এত কষ্ট দিচ্ছ, দ্যাখো, ওর চোখ দ্যাখো, তুমি কি একে পুষতে পারবে?’’
‘‘পুষব বলে এত মেহন্নত করছি না। এটাকে কেটে পাড়াপড়শিদের কাছে খণ্ড-খণ্ড করে বেচব বলেই না এত ঘাম ঝরাচ্ছি!’’
‘‘বেচে তুমি কত টাকা পাবে?’’
‘‘গ্রাম-গাঁয়ে লোকের হাতে কি আর টাকা আছে? যে যা দিতে পারে। তা পনেরো-কুড়ি তো হাতে আসবে।’’
আমি কুড়ি টাকা বার করে লোটকাকে দিয়ে বললুম, ‘‘হরিণটা আমাকে দাও।’’
অন্য লোকেরা এতে আপত্তি করতে যাচ্ছিল, কিন্তু হরিণ যার সে একসঙ্গে কুড়ি টাকা পেয়ে শিঙে বাঁধা গামছা সুদ্ধু হরিণ আমাকে দিয়ে দিল। আমি শক্ত মুঠোয় গামছাটা ধরে হরিণটাকে লঞ্চঘাটায় নিয়ে এসে নদীর তীরে বসে রইলুম। সেদিন সুন্দরবন যাবার আর কোনও লঞ্চ ছিল না। হরিণটার দিকে তাকিয়ে দেখি ওর দুই চোখ কী-রকম ছলছল করছে। বাঁ চোখের কোনায় এক ফোঁটা জল জমে রয়েছে, তাতে সূর্যাস্তের শেষ টুকরোটা চিকচিক করছে দেখতে পেলুম।
ঘাটের কাছে একটা নৌকো আসছে দেখে আমি মাঝিকে বললুম, ‘‘নদী পার করে দিতে হবে।’’
এই সব নৌকোর কাজই নদী পারাপার করা। আমি হরিণটাকে নিয়ে নৌকোয় উঠে বসলুম।
সন্ধে হয়ে আকাশে চতুর্দশীর চাঁদ উঠেছে। জ্যোৎস্না দেখলেই আমার মনে হয় যেন মাইলের পর-মাইল জুঁই ফুটে আছে। দুই চোখ ভরে দেখছি, হঠাৎ ওপারের কাছাকাছি এসে নৌকোর কাছেই দেখি জ্যোৎস্না জড়ানো চঞ্চল নদীতে হরিণ আর আমার ছায়া পাশাপাশি কাঁপছে।
পাড়ে নেমে শিঙের বাঁধন খুলে হরিণটাকে আমি বনের দিকে ছেড়ে দিলুম। অল্প খানিকটা দৌড়ে গিয়ে হরিণ কী ভেবে থমকে দাঁড়াল, পিছন ফিরে আমার দিকে কয়েক মুহূর্ত চেয়ে থেকে আবার দৌড়ে গেল বনের মধ্যে। যতক্ষণ দেখা যায়, আমি দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে তার দৌড়নোর ছন্দ দেখতে লাগলুম।
- – - – - – - – - – - – - – - – - – - – - –

বানান অপরিবর্তিত রইল

তৃতীয় বর্ষ, পঞ্চম সংখ্যা, ভাদ্র ১৩৮৪, অগস্ট, ১৯৭৭।