issue_cover
x
Featurelist detail

z বেলুনে চেপে সাগর পাড়ি
সন্দীপ সরকার

বেলুন হাতে পেলে নিশ্চয় ফুঁ দিয়ে ফুলিয়ে ফেল। আমার কিন্তু পাড়ার রোগাপটকা বেলুনওয়ালার মুখটা চোখের ওপর ভেসে ওঠে। একটা চার চাকার কাঠের গাড়িতে গ্যাসের সিলিন্ডার বসিয়ে ঠেলে সে। তার হাতে থাকে লাল নীল হলুদ নানা রঙের নানা আকারের বেলুন। শব্দটা শুনে কারো কারো অবশ্য বেলুন-চাকির কথাও মনে পড়তে পারে।
কিন্তু শব্দটা শুনলে তোমাদের কি আর ফানুসের কথা মনে আসে? ফানুস তো আর কিছুই নয়, কাগজের তৈরি বিরাট ঠোঙা। নীচে একটা বাতি থাকে। দেশলাইয়ের কাঠি ঠুকে সেটা জ্বেলে দিলে ফানুসের ভেতরের হাওয়া গরম হয়ে ওঠে। গরম হলেই বাতাস হালকা হয়ে যায়। তখন বাইরের ভারী হাওয়ার মধ্যে ফানুস গা ভাসিয়ে উড়ে যায়। ফানুসে আগুন লেগে যেতে নিশ্চয় দেখেছ।
ফানুসকেও ইংরিজিতে বেলুন বলে। কথাটা এসেছে অবশ্য ফরাসী ‘বালোঁ’ থেকে। আর ‘বালোঁ’ এসেছে ‘বল’ থেকে। এমনি বেলুনই বলো, আর ফানুসই বলো, গোলগাল বলের মতোই দেখতে।
আজকে তোমাদের ফানুসের কথাই বলব। একটা বিরাট থলেকে বাতাসের চেয়ে হালকা উত্তপ্ত হাওয়া বা গ্যাস ভর্তি করে ফোলান হয়। সাধারণত বাতাসের চেয়ে হালকা বলে হাইড্রোজেন বা হিলিয়াম গ্যাস ভরা হয়।
এই ফোলানো থলের সঙ্গে একটা বড়-মাথা খোলা বাক্স দড়িদড়া দিয়ে বাঁধা থাকে। দেখতে অনেকটা প্যারাস্যুটের মতো হয়। এই বাক্সে যন্ত্রপাতি, জিনিসপত্র, খাবার-দাবার নিয়ে দু চার জন যাত্রী উড়তে পারে আকাশে। বেলুনের তলায় ঝুলন্ত বাক্সকে বলা হয় ‘কার’ বা ‘গন্ডোলা’।
আকাশে পাখির মতো ওড়ার স্বপ্ন মানুষ সেই আদ্যিকাল থেকেই দেখেছে। পুষ্পকরথের কল্পনা করেছিলেন মহাকবি বাল্মীকি। শ চারেক বছরের কিছু বেশিই হবে, বিশ্ববিখ্যাত শিল্পী লিওনার্দো দা ভিঞ্চি আকাশযানের নকশা মাথা খাটিয়ে এঁকে পর্যন্ত ফেলেছিলেন। আজকে জাম্বো জেট আর গ্রহান্তরে যাবার যান তৈরি হয়েছে, কিন্তু তার পেছনে কত শ বছরের স্বপ্ন, পরিকল্পনা এবং পরিশ্রম আছে, সেটা ভাবো একবার। বেলুনকে তাই প্লেন এবং মহাকাশযানের আদিপুরুষ বলে ধরা হয়।

বেলুন আকাশে ওড়ায় ফরাসীরাই সর্বপ্রথম ২১শে নভেম্বর ১৭৮৩। পারি শহরের সব লোক ভেঙে পড়েছিল ব্যাপারটা দেখতে। এটা তৈরি করেন এতিয়্যান মঁগলফিয়্যার। গরম হাওয়াভর্তি বেলুনের খোলটা ছিল মস্ত-মস্ত কাগজ জুড়ে তৈরি বিরাট একটা ঠোঙা। এমন ফোলানো-ফাঁপানো ঠোঙার নীচেকার গন্ডোলায় বসে চুল্লিতে কাঠকুটো পুরে ফানুসটাকে ভাসমান রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছিল।
বিপজ্জনক এই বেলুনটা দেখে ফরাসী রাজা ষোড়শ লুই মন্তব্য করেছিলেন, পরীক্ষামূলকভাবেও কেউ এই বেলুনে উড়তে চাইবে না। দরকার পড়লে আমাকে বলো, দুটো মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত কয়েদীকে দেব। তাদের চড়িয়ে দেবে।
অবশ্য প্রথমে যে দু’জন বেলুন চেপে আকাশে উড়েছিলেন, তাঁরা কিন্তু কেউ কয়েদী নন— পিলাত্র দ্য রজিয়্যার এবং মারকুই দারলাঁদ। এঁরা কুড়ি মিনিট ধরে তিন হাজার ফুট ওপর দিয়ে উড়েছিলেন প্যারিসের এদিক থেকে ওদিক।

কিছু দিন ধরে পদার্থবিজ্ঞানী অধ্যাপক শার্ল হাইড্রোজেন ভর্তি বেলুন নিয়ে পরীক্ষা করেন। ১৭৮৩ সালের ডিসেম্বর মাসে শার্ল হাইড্রোজেন ভর্তি বেলুন ওড়ান। দর্শকদের মধ্যে ছিলেন মার্কিন দার্শনিক বেঞ্জামিন ফ্রাংকলিন।
একজন মন্তব্য করলেন, ‘‘শার্লের বেলুন মানুষের কী উপকারে লাগবে?’’
ফ্রাংকলিন শান্ত স্বরে উত্তর দিলেন, ‘‘নবজাত শিশু কার উপকারে লাগে?’’
এর দু বছর পর ফ্রান্স থেকে বেলুন চেপে ইংলিশ চ্যানেল টপকে ইংলন্ডে যান ব্লাশার্দ। ভার কমানোর জন্য এক সময় তিনি সব খুলে নীচে ফেলে দেন। এমন কী, তার প্যান্ট পর্যন্ত। শুধু আন্ডারওয়ার পরে তিনি ইংলন্ডে নেমেছিলেন। দুঃসাহসিকতার জন্য ব্লাশার্দের আমৃত্যু ভাতার ব্যবস্থা করেন ষোড়শ লুই। হতভাগ্য পিলাত্র্ দ্য রজিয়্যার ব্লাশার্দের দেখাদেখি বেলুনে চেপে ইংলিশ চ্যানেল পেরুতে গিয়ে ডুবে মারা যান। ১৮১৯ সালে ব্লাশার্দের স্ত্রী বেলুনে উড়তে গিয়ে প্রাণ দেন।
আজকের পাইলট এবং অ্যাস্ট্রোনটদের যুগে বসে হয়তো বেলুন যাত্রীদের কথা ভাবলে তোমার হাসি পেতে পারে। আজকের নভশ্চরদের চেয়ে এঁদের দুঃসাহস কিন্তু কম ছিল না। কারণ ফানুস-আঁটা নড়বড়ে একটা বাক্সে বসে তাঁরা প্রাণ হাতে করে উ়ড়েছেন। এক হিসাবে বলা যায় যে, বেলুন যদি বীজ হয়, তাহলে প্লেন হল চারাগাছ, আর মহাকাশযান বৃক্ষ। বেলুনে চেপে মানুষের ওড়াউড়িতে সমস্ত ইউরোপে উত্তেজনা চরমে উঠেছিল। ফরাসী দেশে তো কথাই নেই। প্রখ্যাত ফরাসী সাহিত্যিক জুলে ভার্ন এ নিয়ে রহস্যময় দ্বীপের রোমহর্ষক কাহিনী লিখে ফেলেছিলেন। তোমরা হয়তো বইটা পড়েছ।

এর পর থেকে ফরাসীরা প্রচুর উৎসাহ নিয়ে বেলুন তৈরি করতে লেগে গেল। গত শতাব্দীতে বিসমার্কের জার্মান সৈন্য এসে পারি শহরটা ঘিরে ফেলে। অবরুদ্ধ শহরবাসীরা বুঝতে পারল, বেলুন চেপে শত্রুর মাথার উপর দিয়ে উড়ে গিয়ে মিত্রদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে পারবে। কখনো কখনো জার্মানদের গুলি খেয়ে বাণবিদ্ধ পাখির মতো মুখ থুবড়ে পড়েছে বেলুন। ফরাসীরা বেলুন নিয়ে কেমন পাগল ছিল, একটা ব্যাপারে সেটা বোঝা যায়। শত্রু-পরিবেষ্টিত পারি শহরের আকাশে উঠে একজন বৈজ্ঞানিক সূর্যগ্রহণ দেখেছিলেন। ইউজিন গোদার আট শ বার বেলুনে চেপে আগেই বিখ্যাত হয়েছিলেন। তিনি একটা বেলুন তৈরির কারখানাই খুলে ফেলেছিলেন এইসময়। তাছাড়া বেলুনে ওড়া শেখাবার ইস্কুলও করেছিলেন।

পারি শহর অবরুদ্ধ থাকার সময় ছেষট্টিটা বেলুন ডাক নিয়ে উড়ে গিয়েছিল। এগারো টন সরকারী কাগজপত্র এবং পঁচিশ লক্ষ চিঠি শত্রুর মাথার ওপর দিয়ে উড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। অবশ্য হাওয়ার গতি অন্যদিকে হলেই বিপদ হত। হলান্ড বা বেলজিয়াম ফরাসীদের বন্ধু-দেশ। সুতরাং বেলুন নামলে ক্ষতি ছিল না। দু-একবার বেলুন জার্মানদের মধ্যে পড়েছে। একবার একটা বেলুন পনেরো ঘণ্টা উড়ে গিয়ে পড়ে ন শ’ মাইল দূরে বরফ ঘেরা নরওয়েতে। তবু বেলুনে করে চিঠিপত্র পাঠাতে পেরেছিল বলে শত্রু পরিবেষ্টিত পারির লোকজন হতাশায় ভেঙে পড়েনি।
১৮৭৩ সালে তিন জন বেলুনযাত্রী আটলান্টিক মহাসাগর পার হবার চেষ্টা করেন। ষাট মাইল গিয়ে বেলুনটা গোঁত্তা খেয়ে পড়ে। ১৮৮১ সালে আবার আরেক দল একই চেষ্টা করে ব্যর্থ হন।
১৯৫৮ পর্যন্ত বেলুনে করে আটলান্টিক পাড়ি দেবার দুঃসাহস দেখাননি আর কেউ। এই বছরে চার জন ব্রিটিশ অভিযাত্রী আটলান্টিক পেরুবার চেষ্টা করেন। সফল হননি অবশ্য। এরপর এগারোবার এই চেষ্টা হয়। কিন্তু এগারোবারই অভিযাত্রীরা ব্যর্থ হন।
সব শেষের বার আটলান্টিকের ওপর দিয়ে ‘সিলভার ফক্স’ নামে একটা বেলুনে চেপে পাড়ি দেন এ়ড ইয়ুস্ট। তাঁর তিন জন সহযোগী রিচার্ড কিউসার, জেরি মেলসা এবং ব্রুস হফার তাঁকে এই বেলুন তৈরি করতে সাহায্য করেছিলেন। ওড়বার সময় পর্যন্ত খাটা-খাটনি করার জন্যে ইয়ুস্টের সঙ্গে ছিলেন তিনজনই। সিলভার ফক্সের সঙ্গে রেডিওতে সংবাদ আদানপ্রদান যাতে চালু থাকে, তার জন্য ভেরা সাইমন এবং কর্নেল জোস্টে কিটিঙ্গার (ছোট) ওয়াশিংটন এবং লন্ডনে দুটো রেডিও স্টেশন চালু রাখেন। পাকাপাকি সব ব্যবস্থা ছিল। সিলভার ফক্সে বসেই ইয়ুস্ট বড় বড় যাত্রিবাহী প্লেন কোম্পানির কাছে আবহাওয়া কেমন যাবে তার খবর পেতেন নিয়মিত।
৫ই অক্টোবর ১৯৭৬ সিলভার ফক্স বেলুনে চেপে যাত্রা করেন এড। মার্কিন মুলুকের মেইন রাজ্যের মিলব্রিজ থেকে রওনা হয়ে আটলান্টিক মহাসাগরের ওপর দিয়ে উড়ে যাবেন তিনি। তাঁর নিশ্চয় মনে প়ড়েছিল, গত দশ বছরে বারোজন অভিযাত্রী এই চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছেন। পাঁচজন মারাও গেছেন।
ইউরোপ তাঁর গন্তব্য। কিন্তু এডের মনে অনেক স্বপ্ন। বেলুনে সবচেয়ে বেশিক্ষণ থাকবেন। বেশি উঁচু দিয়ে উড়ে যাবেন তিনি। তাঁর মনের ইচ্ছা, ষাট বছরের পুরনো জার্মানদের রেকর্ড ভাঙবেন।
বেলুন আস্তে আস্তে আকাশে ওড়ে। হাত না়ড়েন এড। নীচে দাঁড়িয়ে আত্মীয়স্বজন বন্ধুবান্ধব রুমাল নাড়ে। আটলান্টিক পেরুবার জন্য তৈরি অন্যান্য বেলুনের চেয়ে সিলভার ফক্স ছোট। মাত্র আশি ফুট উঁচু। নাইলনের ফানুস। তার মধ্যে হিলিয়াম গ্যাস পোরা হয়েছে। বেলুন আর গন্ডোলা মিলিয়ে দু টনের কম ওজন গন্ডোলাটা নৌকার মতো দেখতে। আটলান্টিকে পড়লে নৌকার মতো ভেসে থাকতে পারবে।
দুরন্ত হাওয়ায় সিলভার ফক্স ধীরে-ধীরে উত্তরে ভেসে চলে। প্রথম দিন সূর্যাস্তের সময় কানা়ডার সেন্ট লরেন্স উপসাগরে গিয়ে পৌঁছয়।
সব চুপচাপ। নীচে নীল সমুদ্র। ওপরে নীল আকাশ। একা এড। ছেলেবেলার কথা মনে পড়ে তাঁর। বাড়ির কথা। এমন বিচ্ছিন্ন মনে হয় নিজেকে! রাত্রির আকাশে তারা ফোটে। শিশুর মতো টলতে টলতে চাঁদ ওঠে। ঘুমিয়ে পড়েন এড। ঘুম ভাঙলে দেখেন জোনাকির মতো অসংখ্য তারা। কখনো দেখেন ভোর হচ্ছে। বুড়ো আঙুলের ওপর ভর দিয়ে সূর্য কেমন উঠল।
তৃতীয় দিন সকালে দক্ষিণ দিকে ভেসে আটলান্টিকের মাঝামাঝি পৌঁছয় সিলভার ফক্স। ওপরে মেঘ সূর্যের আলো ঢেকে দেয়। হিলিয়াম গ্যাস উত্তাপের অভাবে ঘন হয়। চুপসে যেতে থাকে বেলুন। গন্ডোলায় মূল্যবান জ্বালানি পুড়িয়ে এড গরম করতে থাকেন হিলিয়াম। গন্ডোলায় রয়েছে উচ্চতা মাপার অনেক যন্ত্রপাতি। তবু এড তাঁর নিজের নখ পরীক্ষা করেন। কারণ অক্সিজেনের অভাব হলে নখ নীল হয়ে যায়।
ঘুমিয়ে থাকার সময় বেলুন যাতে সমুদ্রে ঝপাত করে না পড়ে, তার ব্যবস্থা করেছেন এড। মোটর সাইকেলের হর্ন লাগানো ব্যারোমিটার আছে। বেলুন তিন হাজার ফুটের নীচে নামলেই হর্ন বেজে উঠবে আপনা থেকে।
একসময় খেয়াল হয় তাঁর, হাওয়ায় ভেসে বেলুন ইউরোপ থেকে দূরে চলে যাচ্ছে। শেষে খাবার জল রেডিও- টুকিটাকি সব ফেলে দেন নীচের সমুদ্রে। এতে আর-একদিন অন্তত হাওয়ায় ভেসে থাকা যাবে। এডের চোখে জল। শেষে সমুদ্রে নেমে আসে বেলুন। পর্তুগালের উপকূল থেকে মাত্র সাতশ মাইল দূর। এডকে দেখতে পেয়ে তুলে নিল একটা জাহাজ।
মানুষ কি বেলুনে চেপে আটলান্টিক পেরুতে পারবে না? অবশ্যই পারবে। কে জানে, হয়তো তুমিই চড়বে সেই বেলুনের গন্ডোলায়।

=======================================================================================================

তৃতীয় বর্ষ, দশম সংখ্যা, মাঘ, ১৩৮৪ সাল (জানুয়ারি, ১৯৭৮)। বানান অপরিবর্তিত রাখা হল।