Category Archives: Featurelist detail

বেলুনে চেপে সাগর পাড়ি

বেলুন হাতে পেলে নিশ্চয় ফুঁ দিয়ে ফুলিয়ে ফেল। আমার কিন্তু পাড়ার রোগাপটকা বেলুনওয়ালার মুখটা চোখের ওপর ভেসে ওঠে। একটা চার চাকার কাঠের গাড়িতে গ্যাসের সিলিন্ডার বসিয়ে ঠেলে সে। তার হাতে থাকে লাল নীল হলুদ নানা রঙের নানা আকারের বেলুন। শব্দটা শুনে কারো কারো অবশ্য বেলুন-চাকির কথাও মনে পড়তে পারে।
কিন্তু শব্দটা শুনলে তোমাদের কি আর ফানুসের কথা মনে আসে? ফানুস তো আর কিছুই নয়, কাগজের তৈরি বিরাট ঠোঙা। নীচে একটা বাতি থাকে। দেশলাইয়ের কাঠি ঠুকে সেটা জ্বেলে দিলে ফানুসের ভেতরের হাওয়া গরম হয়ে ওঠে। গরম হলেই বাতাস হালকা হয়ে যায়। তখন বাইরের ভারী হাওয়ার মধ্যে ফানুস গা ভাসিয়ে উড়ে যায়। ফানুসে আগুন লেগে যেতে নিশ্চয় দেখেছ।
ফানুসকেও ইংরিজিতে বেলুন বলে। কথাটা এসেছে অবশ্য ফরাসী ‘বালোঁ’ থেকে। আর ‘বালোঁ’ এসেছে ‘বল’ থেকে। এমনি বেলুনই বলো, আর ফানুসই বলো, গোলগাল বলের মতোই দেখতে।
আজকে তোমাদের ফানুসের কথাই বলব। একটা বিরাট থলেকে বাতাসের চেয়ে হালকা উত্তপ্ত হাওয়া বা গ্যাস ভর্তি করে ফোলান হয়। সাধারণত বাতাসের চেয়ে হালকা বলে হাইড্রোজেন বা হিলিয়াম গ্যাস ভরা হয়।
এই ফোলানো থলের সঙ্গে একটা বড়-মাথা খোলা বাক্স দড়িদড়া দিয়ে বাঁধা থাকে। দেখতে অনেকটা প্যারাস্যুটের মতো হয়। এই বাক্সে যন্ত্রপাতি, জিনিসপত্র, খাবার-দাবার নিয়ে দু চার জন যাত্রী উড়তে পারে আকাশে। বেলুনের তলায় ঝুলন্ত বাক্সকে বলা হয় ‘কার’ বা ‘গন্ডোলা’।
আকাশে পাখির মতো ওড়ার স্বপ্ন মানুষ সেই আদ্যিকাল থেকেই দেখেছে। পুষ্পকরথের কল্পনা করেছিলেন মহাকবি বাল্মীকি। শ চারেক বছরের কিছু বেশিই হবে, বিশ্ববিখ্যাত শিল্পী লিওনার্দো দা ভিঞ্চি আকাশযানের নকশা মাথা খাটিয়ে এঁকে পর্যন্ত ফেলেছিলেন। আজকে জাম্বো জেট আর গ্রহান্তরে যাবার যান তৈরি হয়েছে, কিন্তু তার পেছনে কত শ বছরের স্বপ্ন, পরিকল্পনা এবং পরিশ্রম আছে, সেটা ভাবো একবার। বেলুনকে তাই প্লেন এবং মহাকাশযানের আদিপুরুষ বলে ধরা হয়।

বেলুন আকাশে ওড়ায় ফরাসীরাই সর্বপ্রথম ২১শে নভেম্বর ১৭৮৩। পারি শহরের সব লোক ভেঙে পড়েছিল ব্যাপারটা দেখতে। এটা তৈরি করেন এতিয়্যান মঁগলফিয়্যার। গরম হাওয়াভর্তি বেলুনের খোলটা ছিল মস্ত-মস্ত কাগজ জুড়ে তৈরি বিরাট একটা ঠোঙা। এমন ফোলানো-ফাঁপানো ঠোঙার নীচেকার গন্ডোলায় বসে চুল্লিতে কাঠকুটো পুরে ফানুসটাকে ভাসমান রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছিল।
বিপজ্জনক এই বেলুনটা দেখে ফরাসী রাজা ষোড়শ লুই মন্তব্য করেছিলেন, পরীক্ষামূলকভাবেও কেউ এই বেলুনে উড়তে চাইবে না। দরকার পড়লে আমাকে বলো, দুটো মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত কয়েদীকে দেব। তাদের চড়িয়ে দেবে।
অবশ্য প্রথমে যে দু’জন বেলুন চেপে আকাশে উড়েছিলেন, তাঁরা কিন্তু কেউ কয়েদী নন— পিলাত্র দ্য রজিয়্যার এবং মারকুই দারলাঁদ। এঁরা কুড়ি মিনিট ধরে তিন হাজার ফুট ওপর দিয়ে উড়েছিলেন প্যারিসের এদিক থেকে ওদিক।

কিছু দিন ধরে পদার্থবিজ্ঞানী অধ্যাপক শার্ল হাইড্রোজেন ভর্তি বেলুন নিয়ে পরীক্ষা করেন। ১৭৮৩ সালের ডিসেম্বর মাসে শার্ল হাইড্রোজেন ভর্তি বেলুন ওড়ান। দর্শকদের মধ্যে ছিলেন মার্কিন দার্শনিক বেঞ্জামিন ফ্রাংকলিন।
একজন মন্তব্য করলেন, ‘‘শার্লের বেলুন মানুষের কী উপকারে লাগবে?’’
ফ্রাংকলিন শান্ত স্বরে উত্তর দিলেন, ‘‘নবজাত শিশু কার উপকারে লাগে?’’
এর দু বছর পর ফ্রান্স থেকে বেলুন চেপে ইংলিশ চ্যানেল টপকে ইংলন্ডে যান ব্লাশার্দ। ভার কমানোর জন্য এক সময় তিনি সব খুলে নীচে ফেলে দেন। এমন কী, তার প্যান্ট পর্যন্ত। শুধু আন্ডারওয়ার পরে তিনি ইংলন্ডে নেমেছিলেন। দুঃসাহসিকতার জন্য ব্লাশার্দের আমৃত্যু ভাতার ব্যবস্থা করেন ষোড়শ লুই। হতভাগ্য পিলাত্র্ দ্য রজিয়্যার ব্লাশার্দের দেখাদেখি বেলুনে চেপে ইংলিশ চ্যানেল পেরুতে গিয়ে ডুবে মারা যান। ১৮১৯ সালে ব্লাশার্দের স্ত্রী বেলুনে উড়তে গিয়ে প্রাণ দেন।
আজকের পাইলট এবং অ্যাস্ট্রোনটদের যুগে বসে হয়তো বেলুন যাত্রীদের কথা ভাবলে তোমার হাসি পেতে পারে। আজকের নভশ্চরদের চেয়ে এঁদের দুঃসাহস কিন্তু কম ছিল না। কারণ ফানুস-আঁটা নড়বড়ে একটা বাক্সে বসে তাঁরা প্রাণ হাতে করে উ়ড়েছেন। এক হিসাবে বলা যায় যে, বেলুন যদি বীজ হয়, তাহলে প্লেন হল চারাগাছ, আর মহাকাশযান বৃক্ষ। বেলুনে চেপে মানুষের ওড়াউড়িতে সমস্ত ইউরোপে উত্তেজনা চরমে উঠেছিল। ফরাসী দেশে তো কথাই নেই। প্রখ্যাত ফরাসী সাহিত্যিক জুলে ভার্ন এ নিয়ে রহস্যময় দ্বীপের রোমহর্ষক কাহিনী লিখে ফেলেছিলেন। তোমরা হয়তো বইটা পড়েছ।

এর পর থেকে ফরাসীরা প্রচুর উৎসাহ নিয়ে বেলুন তৈরি করতে লেগে গেল। গত শতাব্দীতে বিসমার্কের জার্মান সৈন্য এসে পারি শহরটা ঘিরে ফেলে। অবরুদ্ধ শহরবাসীরা বুঝতে পারল, বেলুন চেপে শত্রুর মাথার উপর দিয়ে উড়ে গিয়ে মিত্রদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে পারবে। কখনো কখনো জার্মানদের গুলি খেয়ে বাণবিদ্ধ পাখির মতো মুখ থুবড়ে পড়েছে বেলুন। ফরাসীরা বেলুন নিয়ে কেমন পাগল ছিল, একটা ব্যাপারে সেটা বোঝা যায়। শত্রু-পরিবেষ্টিত পারি শহরের আকাশে উঠে একজন বৈজ্ঞানিক সূর্যগ্রহণ দেখেছিলেন। ইউজিন গোদার আট শ বার বেলুনে চেপে আগেই বিখ্যাত হয়েছিলেন। তিনি একটা বেলুন তৈরির কারখানাই খুলে ফেলেছিলেন এইসময়। তাছাড়া বেলুনে ওড়া শেখাবার ইস্কুলও করেছিলেন।

পারি শহর অবরুদ্ধ থাকার সময় ছেষট্টিটা বেলুন ডাক নিয়ে উড়ে গিয়েছিল। এগারো টন সরকারী কাগজপত্র এবং পঁচিশ লক্ষ চিঠি শত্রুর মাথার ওপর দিয়ে উড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। অবশ্য হাওয়ার গতি অন্যদিকে হলেই বিপদ হত। হলান্ড বা বেলজিয়াম ফরাসীদের বন্ধু-দেশ। সুতরাং বেলুন নামলে ক্ষতি ছিল না। দু-একবার বেলুন জার্মানদের মধ্যে পড়েছে। একবার একটা বেলুন পনেরো ঘণ্টা উড়ে গিয়ে পড়ে ন শ’ মাইল দূরে বরফ ঘেরা নরওয়েতে। তবু বেলুনে করে চিঠিপত্র পাঠাতে পেরেছিল বলে শত্রু পরিবেষ্টিত পারির লোকজন হতাশায় ভেঙে পড়েনি।
১৮৭৩ সালে তিন জন বেলুনযাত্রী আটলান্টিক মহাসাগর পার হবার চেষ্টা করেন। ষাট মাইল গিয়ে বেলুনটা গোঁত্তা খেয়ে পড়ে। ১৮৮১ সালে আবার আরেক দল একই চেষ্টা করে ব্যর্থ হন।
১৯৫৮ পর্যন্ত বেলুনে করে আটলান্টিক পাড়ি দেবার দুঃসাহস দেখাননি আর কেউ। এই বছরে চার জন ব্রিটিশ অভিযাত্রী আটলান্টিক পেরুবার চেষ্টা করেন। সফল হননি অবশ্য। এরপর এগারোবার এই চেষ্টা হয়। কিন্তু এগারোবারই অভিযাত্রীরা ব্যর্থ হন।
সব শেষের বার আটলান্টিকের ওপর দিয়ে ‘সিলভার ফক্স’ নামে একটা বেলুনে চেপে পাড়ি দেন এ়ড ইয়ুস্ট। তাঁর তিন জন সহযোগী রিচার্ড কিউসার, জেরি মেলসা এবং ব্রুস হফার তাঁকে এই বেলুন তৈরি করতে সাহায্য করেছিলেন। ওড়বার সময় পর্যন্ত খাটা-খাটনি করার জন্যে ইয়ুস্টের সঙ্গে ছিলেন তিনজনই। সিলভার ফক্সের সঙ্গে রেডিওতে সংবাদ আদানপ্রদান যাতে চালু থাকে, তার জন্য ভেরা সাইমন এবং কর্নেল জোস্টে কিটিঙ্গার (ছোট) ওয়াশিংটন এবং লন্ডনে দুটো রেডিও স্টেশন চালু রাখেন। পাকাপাকি সব ব্যবস্থা ছিল। সিলভার ফক্সে বসেই ইয়ুস্ট বড় বড় যাত্রিবাহী প্লেন কোম্পানির কাছে আবহাওয়া কেমন যাবে তার খবর পেতেন নিয়মিত।
৫ই অক্টোবর ১৯৭৬ সিলভার ফক্স বেলুনে চেপে যাত্রা করেন এড। মার্কিন মুলুকের মেইন রাজ্যের মিলব্রিজ থেকে রওনা হয়ে আটলান্টিক মহাসাগরের ওপর দিয়ে উড়ে যাবেন তিনি। তাঁর নিশ্চয় মনে প়ড়েছিল, গত দশ বছরে বারোজন অভিযাত্রী এই চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছেন। পাঁচজন মারাও গেছেন।
ইউরোপ তাঁর গন্তব্য। কিন্তু এডের মনে অনেক স্বপ্ন। বেলুনে সবচেয়ে বেশিক্ষণ থাকবেন। বেশি উঁচু দিয়ে উড়ে যাবেন তিনি। তাঁর মনের ইচ্ছা, ষাট বছরের পুরনো জার্মানদের রেকর্ড ভাঙবেন।
বেলুন আস্তে আস্তে আকাশে ওড়ে। হাত না়ড়েন এড। নীচে দাঁড়িয়ে আত্মীয়স্বজন বন্ধুবান্ধব রুমাল নাড়ে। আটলান্টিক পেরুবার জন্য তৈরি অন্যান্য বেলুনের চেয়ে সিলভার ফক্স ছোট। মাত্র আশি ফুট উঁচু। নাইলনের ফানুস। তার মধ্যে হিলিয়াম গ্যাস পোরা হয়েছে। বেলুন আর গন্ডোলা মিলিয়ে দু টনের কম ওজন গন্ডোলাটা নৌকার মতো দেখতে। আটলান্টিকে পড়লে নৌকার মতো ভেসে থাকতে পারবে।
দুরন্ত হাওয়ায় সিলভার ফক্স ধীরে-ধীরে উত্তরে ভেসে চলে। প্রথম দিন সূর্যাস্তের সময় কানা়ডার সেন্ট লরেন্স উপসাগরে গিয়ে পৌঁছয়।
সব চুপচাপ। নীচে নীল সমুদ্র। ওপরে নীল আকাশ। একা এড। ছেলেবেলার কথা মনে পড়ে তাঁর। বাড়ির কথা। এমন বিচ্ছিন্ন মনে হয় নিজেকে! রাত্রির আকাশে তারা ফোটে। শিশুর মতো টলতে টলতে চাঁদ ওঠে। ঘুমিয়ে পড়েন এড। ঘুম ভাঙলে দেখেন জোনাকির মতো অসংখ্য তারা। কখনো দেখেন ভোর হচ্ছে। বুড়ো আঙুলের ওপর ভর দিয়ে সূর্য কেমন উঠল।
তৃতীয় দিন সকালে দক্ষিণ দিকে ভেসে আটলান্টিকের মাঝামাঝি পৌঁছয় সিলভার ফক্স। ওপরে মেঘ সূর্যের আলো ঢেকে দেয়। হিলিয়াম গ্যাস উত্তাপের অভাবে ঘন হয়। চুপসে যেতে থাকে বেলুন। গন্ডোলায় মূল্যবান জ্বালানি পুড়িয়ে এড গরম করতে থাকেন হিলিয়াম। গন্ডোলায় রয়েছে উচ্চতা মাপার অনেক যন্ত্রপাতি। তবু এড তাঁর নিজের নখ পরীক্ষা করেন। কারণ অক্সিজেনের অভাব হলে নখ নীল হয়ে যায়।
ঘুমিয়ে থাকার সময় বেলুন যাতে সমুদ্রে ঝপাত করে না পড়ে, তার ব্যবস্থা করেছেন এড। মোটর সাইকেলের হর্ন লাগানো ব্যারোমিটার আছে। বেলুন তিন হাজার ফুটের নীচে নামলেই হর্ন বেজে উঠবে আপনা থেকে।
একসময় খেয়াল হয় তাঁর, হাওয়ায় ভেসে বেলুন ইউরোপ থেকে দূরে চলে যাচ্ছে। শেষে খাবার জল রেডিও- টুকিটাকি সব ফেলে দেন নীচের সমুদ্রে। এতে আর-একদিন অন্তত হাওয়ায় ভেসে থাকা যাবে। এডের চোখে জল। শেষে সমুদ্রে নেমে আসে বেলুন। পর্তুগালের উপকূল থেকে মাত্র সাতশ মাইল দূর। এডকে দেখতে পেয়ে তুলে নিল একটা জাহাজ।
মানুষ কি বেলুনে চেপে আটলান্টিক পেরুতে পারবে না? অবশ্যই পারবে। কে জানে, হয়তো তুমিই চড়বে সেই বেলুনের গন্ডোলায়।

=======================================================================================================

তৃতীয় বর্ষ, দশম সংখ্যা, মাঘ, ১৩৮৪ সাল (জানুয়ারি, ১৯৭৮)। বানান অপরিবর্তিত রাখা হল।

আজব দেশে

সামনে ওই মস্ত হাঙরটার মুখোমুখি এসে পড়ে গাড়ির আর-সব ছেলেমেয়ের সঙ্গে ঋকও চেঁচিয়ে উঠল।
আমরা গিয়েছিলাম পৃথিবীর সব চাইতে বড় ফিল্ম স্টুডিও ‘‘ইউনিভার্সাল’’ দেখতে। হলিউডের নাম ঋক তার ভূগোল বইতে পড়েছে, তাই এখানে আসার কথা পাকা হলে ও আনন্দে লাফিয়ে উঠেছিল। একটু আগেই স্টুডিওর গাড়ি চেপে যখন আমরা ওই কৃত্রিম সমুদ্রের পাশ দিয়ে আসছিলাম, নীল জলের ধার ঘেঁষে আস্তে আস্তে এগোচ্ছিল আমাদের গা়ড়িটা, তখন ঋকই বলেছিল, ‘‘ওই দেখো ছোটকাকু, জলের মধ্যে ছোট্ট একটা বোট নিয়ে সাহেবটা কেমন মাছ ধরছে।’’
ডাঙা থেকে একটু দূরে একাগ্রমনে ছিপ হাতে বোটের ওপর বসে ছিল সাহেবটি। একটুও নড়ছিল না। হঠাৎ জলে ঢেউ উঠল। ঘাই দিয়ে উঠল কী যেন একটা। জল দুলে উঠে উলটে দিল বোটটাকে। চোখের পলকে সাহেব চলে গেল জলের মধ্যে, আর সেই সঙ্গে বোটটার কাছে খানিকটা নীল জল— জলের মধ্যে চাপ-চাপ রক্ত মিশলে যেমন দেখায়— তেমন হয়ে উঠল। আমরা যখন একদৃষ্টে তাকিয়ে ছিলাম তখন আচমকা জলের একেবারে ধারে এসে আমাদের গাড়িটা কাত হয়ে পড়ল। জল তোলপাড় করে গাড়ির জানলার কয়েক হাতের মধ্যে উঠে এল বিশাল একটা হাঙরের হাঁ-মুখ। ঋক কাঁদেনি, কিন্তু অনেকগুলো ছেলেমেয়ে এক সঙ্গে কেঁদে উঠল গাড়ির মধ্যে। চব্বিশ ফুট লম্বা ওই হাঙরটার একেবারে দাঁতের নাগালে এসে পড়ে আঁতকে ওঠেনি এমন লোক গাড়িতে একজনও ছিল না।
অথচ, মোটামুটি সবাই জানে, জল ঠেলে উঠে আসা ওই হাঙরটা সত্যিকারের নয়। ওটা ‘জ’ (Jaw) নামে একটা চলচ্চিত্রের জন্যে বানানো যান্ত্রিক হাঙর। আর বোটে-বসা মাছধরার লোকটাও যে সত্যিকারের মানুষ নয়, খানিক পরেই বোঝা গেল ভাল করে। পুরো ব্যাপারটাই সাজানো। এর পরেই হাঙরটা আবার ডুবে গেল। আমাদের কাত হয়ে যাওয়া স্টুডিওর গাড়িটা আবার সোজা হল। আর, জলের মধ্যে ছোট সেই বোটটা ভেসে উঠল আবার। সাহেবটি মাছ ধরতে লাগল আগের মতো।
চমকের পালা চলছে একের পর এক। সারা দুনিয়া থেকে দর্শক আসে এই স্টুডিও-শহর দেখতে। বেশি মজা পায় ছোটরা। ১৯৭৬ সালেই ৩০ লক্ষ দর্শক ছুটে এসেছে এখানে পৃথিবীর নানা জায়গা থেকে।
ইউনিভার্সাল সত্যিই তুলনাহীন। পাহাড়ের কোলে চারশো একরের বেশি জায়গা নিয়ে গড়ে ওঠা এই কৃত্রিম স্টুডিওর মধ্যে পাওয়া যাবে না এমন জিনিস নেই। কৃত্রিম সমুদ্র, হ্রদ, জলপ্রপাত, শতশত প্রাসাদ, আধুনিক এবং মধ্যযুগের শহর, গঞ্জ, তুষারাঞ্চল, মাইলের পর মাইল রাস্তা, নিজস্ব রেলপথ, ডাকঘর, ব্যাঙ্ক, ফায়ারব্রিগেড— সবই আছে।
লস এঞ্জেলেসে এসে চওড়া-চওড়া সুন্দর সাজানো রাস্তা দেখে খুব ভাল লেগেছে ঋকের। পাশাপাশি ছটা গাড়ি যেতে পারে, আসতে পারে আরও ছটা একসঙ্গে। এগুলোর নাম ফ্রী ওয়ে। রাস্তা পারাপার করার জন্যে যে আলো জ্বলে তাতে লেখা থাকে, ‘‘Walk’’ কিংবা ‘‘Dont walk’’। সেই রকম একটা রাস্তা ধরে সান্তামনিকা বুলেভার্ড থেকে বেশ সকাল সকাল ঋককে সঙ্গে নিয়ে পৌঁছেছি এখানে। স্টু়ডিও শহরে প্রবেশ তোরণের আগে পাহাড়ের মাথায় আছে গাড়ি রাখার জায়গা। সেখানে গাড়ি রেখে— স্টুডিওর ভেতরে এসে উঠেছিলাম এই গাড়িতে। ইউনিভার্সালের নিজস্ব গাড়ি। এগুলোর নাম ‘‘গ্লেমর ট্রাম’’। স্টুডিও শহরে ঢুকতে মাথা পিছু ছ-ডলার লাগে।
প্রতিটি গ্লেমর ট্রামে থাকে তিনটে করে কামরা। একটা কামরায় গিয়ে বসলাম আমরা। ঋক বসল ধারের দিকের আসনে। গাড়ি চলতে শুরু করল, খানিক পরেই ঋক বলে উঠল, ‘‘ছোট কাকু, ওই দেখো বোল্ডার! বোল্ডার!’’
তাকিয়ে দেখি আমাদের গাড়ির ডানদিকে— পাহাড়ের ঢাল বেয়ে অসংখ্য বড় বড় পাথর হুড়মুড় করে গড়িয়ে নামছে। ওর একটা গায়ে এসে পড়লেই গুঁড়িয়ে যাব। ওগুলো দ্রুত গড়িয়ে নামছে ঠিক যেন গা়ড়িতে আছড়ে পড়বে বলেই! পড়লও। তবে পড়ে গাড়ি কিংবা যাত্রীদের কাউকে আহত করল না, ছিটকে গেল। ঋক হাসতে শুরু করল। সত্যি ওই বিশাল বিশাল পাথরের চাঁইগুলো নিজে হাতে তুলে না দেখলে কার সাধ্য বোঝে যে ওগুলো স্পঞ্জের তৈরি। পরে দেখলাম ঋকের চাইতেও অনেক ছোট ছোট ছেলেমেয়ে ফোটো তোলার জন্যে ওগুলো তুলে নিয়ে এটলাসের ভঙ্গিতে পৃথিবী ঘাড়ে করে দাঁড়াচ্ছে।
হঠাৎ দেখি দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে একটা মস্ত দালানে। মুহূর্তে আবার নিভে গেল। বাড়িটা দেখলাম অক্ষতই আছে।
ঋকের কাছে সবচেয়ে বড় জাদু ছিল ‘‘রেড সী’’র জল দুভাগ হয়ে যাওয়া। ওখানে ছশো ফুট লম্বা আর দেড়শো ফুট চওড়া জলাধারটির নাম ‘‘রেড সী’’। আমাদের গ্লেমর ট্রাম তার কাছে যেতেই দেখা গেল নদীর জল মাঝখান থেকে দুভাগ হয়ে যাচ্ছে। আমাদের গাড়ি চলে এল তার ভেতর দিয়ে। আর গাড়ি নদী পেরিয়ে যাবার পরেই ভাগ হয়ে যাওয়া জলের ধারা আবার আগেকার মতো একাকার হয়ে গেল। বৈদ্যুতিক কুহকের এমন মজায় তাজ্জব বনে গিয়ে ঋক তো খানিকটা সময় কোনো কথাই বলতে পারল না।
চমকের পর চমক। একটার ঘোর কাটতে না কাটতেই আর একটা এসে পড়ে। মাঝারিগোছের একটা কাঠের সেতুর ওপর দিয়ে যাচ্ছিল গ্লেমর ট্রাম। নীচে হ্রদ। জানলা দিয়ে আমরা তাকিয়ে ছিলাম নীচের দিকে। আচমকা সেতুর এক পাশের ভারি কাঠামো হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ে গেল নীচের হ্রদে। ধাক্কা সামলে শান্ত হলে দেখা গেল, ভাঙা কাঠামো আবার উঠে গিয়ে জোড়া লেগে যাচ্ছে।
ইউনিভার্সাল স্টুডিওর তোলা বিখ্যাত ছবিগুলোর নানান স্মৃতি ছড়িয়ে আছে এখানে ওখানে। ‘‘দি স্টিং’’, ‘‘অল কোয়ায়েট অন দ্য ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট’’, ‘‘আর্থকোয়েক’’; ‘‘এয়ারপোর্ট ১৯৭৫’’, ‘‘জ’’, ‘‘স্পার্টাকাস’’-এ স্টুডিওর গৌরবের অন্ত নেই। আলফ্রেড হিচককের বিখ্যাত ছবি ‘‘সাইকো’’র বাড়িটাকে দেখাতে ঋক বলল, ‘‘বাড়িটার দিকে তাকালেই কীরকম যেন গা-ছমছম করে ওঠে, তাই না?’’
সারা স্টুডিও-শহর জুড়ে এইসব বড় বড় চমক ছাড়াও ছোটদের আনন্দ দেওয়ার জন্য এত অসংখ্য জিনিস আছে যে, মনে রাখা মুশকিল। পথের মাঝখানে আচমকা বন্যার জল এসে প়ড়া, বজ্রবিদ্যুৎসহ বৃষ্টিপাত কিংবা চোরাবালির মধ্যে আর্তনাদ করতে-করতে স্টুডিওরই কোন কর্মীর ডুবে যাওয়ার মতো দৃশ্য যে কত আছে তার ইয়ত্তা নেই। তবে আর একটা বিস্ময়, ঋক যেটার কথা কখনই ভুলতে পারবে না সেটা হল তুষারাঞ্চলের ঘুরপাক। বাব্বা! কয়েক মিনিট ধরে কী কাণ্ডটাই যে হল!
গ্লেমর ট্রাম উঠে আসছিল ওপর দিকে। অল্প উঠতেই দেখা গেল পাহাড়ের গায়ে লেখা— ২৪,০০০ ফুট উচ্চতা। তারপর গাড়িটা বাঁক নিয়েই একটা বড় সুড়ঙ্গের মধ্যে ঢুকে গেল। সুড়ঙ্গের ঝকঝকে বরফের মতো দেওয়াল ঘুরতে শুরু করে দিল। সেই সঙ্গে হিমবাহের ধস নেমে প্রচণ্ড শব্দ। ভয়ে বুক গুঁড়িয়ে যাবার জোগাড়। যেন হিমবাহের ধসে নেমে যাচ্ছি সবাই।
সকাল থেকে বিকেলের আগে পর্যন্ত এসব দেখেই কাটল। বিকেল থেকে আবার অন্যরকম মজা। হাজার-হাজার দর্শক বসতে পারে এমন এক এম্‌ফিথিয়েটরে বসে দেখা গেল তালিম নেওয়া কুকুর আর কাকাতুয়ার খেলা। দু’জন দর্শককে আমাদের সামনেই সাজান হল মিস্টার আর মিসেস ফ্রাঙ্কেনস্টাইন। অন্য আর এক জায়গায় দর্শকদের নিয়েই একটা অগ্নিকাণ্ডের দৃশ্যের শুটিং তুলে তক্ষুনি সেটা আবার দেখিয়ে দেওয়া হল পর্দায়।

ছবি : অনুপ রায়

তৃতীয় বর্ষ, দ্বাদশ সংখ্যা, চৈত্র ১৩৮৪ (মার্চ, ১৯৭৮)। বানান অপরিবর্তিত রাখা হল।

মাসিক আনন্দমেলার ছোট্ট বন্ধুদের প্রতি

feature=24.12.218-big1 ‘আনন্দমেলা’-র ছোট্ট বন্ধুরা,
আর অল্প কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আমরা তোমাদের সুন্দর দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছি। কিন্তু আমার স্মৃতিতে চির-উজ্জ্বল থাকবে এখানকার জনগণের কথা, যারা তাদের স্নেহভালবাসার অনেকখানিই উজাড় করে দিয়েছে আমার আর আমার সহখেলোয়াড়দের উপর। ব্যক্তিগতভাবে তোমাদের সঙ্গে দেখা করতে এবং আলাপ করতে পারিনি, সেজন্য আমি দুঃখিত। কিন্তু তোমাদের কিছু বলতে চাই। আর তা আমাকে এখনই বলতে হবে। কারণ, আর কখনও তোমাদের দেশে আসতে পারব কিনা জানি না তো।

feature=24.12.218-big2

প্রথমেই তোমাদের ধন্যবাদ জানাতে হয় তোমাদের পত্রিকার ‘পেলে সংখ্যা’-র জন্য, যা আমাকে একটি দেওয়া হয়েছে। দুর্ভাগ্যের বিষয়, ওটি আমি পড়তে পারিনি। তবুও ওর পাতায় পাতায় আমার প্রতি তোমাদের শ্রদ্ধা ও ভালবাসার যে সুস্পষ্ট প্রমাণ পেলাম তা গভীরভাবে আমার হৃদয় স্পর্শ করেছে।
ফুটবলের প্রতি প্রগাঢ় আসক্তির যে নিদর্শন এই মহানগরীর যুবসমাজ দেখাল, তাতে আমি অভিভূত হয়েছি। যদি এই আসক্তির সঙ্গে থাকে দৃঢ় সঙ্কল্প, শৃঙ্খলা, নিষ্ঠা, কঠোর পরিশ্রম আর বিজ্ঞানসম্মত প্রশিক্ষণ তাহলে তোমাদের দেশ যে আন্তর্জাতিক ফুটবলের আসরে নিজের স্থান করে নেবে সে সম্পর্কে আমি নিশ্চিত।
এখানেই থামতে হচ্ছে। শুধু আর-একটা কথা। মানুষ হও এবং দেশকে কিছু দাও।
ঈশ্বর তোমাদের সহায় হোন! বিদায়!
ইতি তোমাদের বন্ধু
পেলে
কলকাতা, ভারত

বানান অপরিবর্তিত রাখা হল
কার্তিক, ১৩৮৪ (অক্টোবর, ১৯৭৭)

সমুদ্রের দৈত্য

তিমিকে সমুদ্রের দৈত্য ছাড়া কী-ই বা বলা চলে? খৃষ্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দীতে গ্রীস দেশের প্রখ্যাত দার্শনিক-বৈজ্ঞানিক অ্যারিস্টটল বুঝতে পেরেছিলেন, তিমি মাছ নয়, জলচর জন্তু। স্তন্যপায়ী। পৃথিবীতে এত বড় জন্তু আর দেখা দেয়নি। নীল তিমি হল সবচেয়ে বড় জাতের তিমি। প্রাগৈতিহাসিক জন্তু ডা‌ইনোসর পর্যন্ত নীল তিমির চাইতে আকারে ছোট। নীল তিমি লম্বায় নব্বই থেকে একশ ফুট পর্যন্ত হয়, দেহের ওজন দুশো টন বা তেত্রিশটা আফ্রিকান হাতির সমান। সবচেয়ে ছোট্টখাটোট জাতের তিমিও দৈর্ঘ্যে ন-ফুট। জন্মের সময় তিমির বাচ্চার দেহের ওজন দেড় থেকে চার টন পর্যন্ত হয়। বছরদুয়েকের মধ্যে তার ওজন বাড়ে ত্রিশ থেকে চল্লিশ হাজার পাউন্ড।
তিমিকে মানুষ দেখেছে বিস্ময়ের চোখে। কখনো ভয় আর ভক্তিতে সে চোখ বুজে ফেলেছে। তিমি সম্বন্ধে কিংবদন্তী আর উপকথা চালু আছে নানান দেশে। মানুষের আঁকা ছবিতে আর লেখা তার ছাপ পর্যন্ত পড়েছে। ক্রীট দ্বীপের প্রাচীন সভ্যতার উদাহরণ হল, মিনোয়ান রাজ্যের রাজধানী নোসস। এই নোসসের এক মন্দিরে চার হাজার বছর আগে কোনো এক শিল্পী দেওয়ালচিত্রে এঁকেছেন তিমি। গ্রীস আর রোমের মন্দিরের গায়েও সে নিজের জায়গা করে নিয়েছিল। গল্পে আছে সিন্ধুবাদ নাবিক সমুদ্রে ভাসমান তিমির পিঠকে দ্বীপ বলে ভুল করে সেখানে রান্নার আয়োজন করেছিল। শেষে আগুন জ্বালতেই তিমি হুশ করে ডুব দেয়। গত শতাব্দীতে তিমি শিকারের শ্রেষ্ঠ রূপ কাহিনী ‘মবি ডিক’ লেখেন হারমেন মেলভিল।
তিমি বহু আগে স্থলচর ছিল। বিজ্ঞানীরা প্রমাণ পেয়েছেন, ছ-লক্ষ বছর আগে এক দল লোমশ চারপেয়ে স্তন্যপায়ী, খাবার বা আশ্রয়ের খোঁজে জলে নেমেছিল। বহুকাল জলে থাকতে থাকতে পেছনের পা দুটোর বদলে দেখা দিল লেজ। দেখতে মাছের লেজের মতো অনেকটা। তফাত হল তিমির লেজ খাড়া নয় শোয়ানো, তাই ডাইনে-বাঁয়ে নাড়া যায় না। কিন্তু ওপরে-নীচে নাড়ে। তেমনি সামনের হাতের বদলে গজাল পাখনা। জলে থাকার ফলে এক সময় লোমের বদলে মোটা পুরো চর্বির আস্তরণ গজাল। একেই বলে ব্লবার, গলালে খুব ভাল তেল হয়। মাছের সঙ্গে তিমির কয়েকটা পার্থক্যের মধ্যে একটা হল মাছের মতো সে ডিম পাড়ে না। মানুষের মতো তারও বাচ্চা হয় একটা একটা করে। মা তিমি বাচ্চাকে বুকের দুধ খাওয়ায় দিনে চল্লিশ বার অর্থাৎ পাঁচশ পঞ্চাশ লিটার বা হরিণঘাটার এক হাজার একশ বোতল দুধ। তবে সে দুধ নাকি যেমন খাঁটি তেমনি পুষ্টিকর। তাতে আমিষের ভাগটাই বেশি। হাজার হোক তিমির দুধ বলে কথা!
মাছের সঙ্গে আরেকটা বড় রকমের তফাত হল, তিমি ফুসফুস দিয়ে নিশ্বাস নেয়। জলে থাকার দরুন নাকের ফুটো মাথার ওপরে সরে গেছে। জলের নীচে ডুব দিয়ে বহুক্ষণ থাকে। যখন দম নেবার জন্যে জলের ওপর মাথা তোলে, তখন তার মাথার ওপর কুড়ি ফুট পর্যন্ত উঁচু ফোয়ারার মতো দেখা যায়। ফোয়ারা দেখেই জাহাজীরা বোঝে, তিমি। বৈজ্ঞানিকদের মতে এটার মধ্যে জলের ভাগ খুব সামান্য। ফুসফুস থেকে নিশ্বাসের জমাট হাওয়া বাইরে এলে এই হয় অবস্থা। শীতের ভোরে কথা বলতে গেলে আমাদের মুখ থেকে যেমন ধোঁয়া বেরোয়, এও তাই।
মানুষের চেয়ে তিমির মগজের ওজন বেশি। স্পার্ম জাতের তিমির মাথার ঘিলুর ওজন কুড়ি পাউন্ড। এত ‘ধূসর পদার্থ’ আর কোনো প্রাণীরই মাথায় নেই। মানুষেরও না। মানুষের মতোই তিমির আয়ু আশি বছর। কোনো কোনো তিমি স্ত্রী-ছেলেমেয়ে নিয়ে সংসার করে। দল বাঁধে। চাঁদনী রাতে সমুদ্রে খেলা করে। একজন বিপদে পড়লে অন্যরা ছুটে আসে। মানুষের মতো ভ্রমণ করতে ভালবাসে। গ্রীষ্মকালে মেরু অঞ্চলে যখন বরফ গলে তখন তারা সেখানে খাবার খুঁজতে হাজির হয়। এইখানেই তাদের বাচ্চা হয়। শীত পড়লে উষ্ণতর অঞ্চলে ফেরে। আবার মানুষেরই মতো তাদের নিউমোনিয়া, টি বি, ক্রিমি হয়। এমন কী, তিমিদের দলে দলে আত্মহত্যা করতেও দেখা গেছে। তারা নিজেদের ভাষায় কথাবার্তা বলে। ডাঙার জীব হয়েও তারা জলের পরিবেশে নিজেদের খাপ খাইয়ে নিয়েছে। মুখ থেকে গুরুগম্ভীর আওয়াজ ভীষণ জোরে ছুঁড়ে দিয়ে, জলের মধ্যে ধ্বনি প্রতিধ্বনি শুনেই তারা ধরতে পারে চারপাশের জায়গাটা কেমন।
তিমি শিকার কিন্তু খুব পুরনো ব্যাপার। নরওয়েতে তিমির কঙ্কালের সঙ্গে চার হাজার বছরের পুরনো পাথরের ‘হারপুন’ পাওয়া গেছে। হারপুন এক রকম বর্শা, যা ছুঁড়ে তিমি শিকার করা হয়। হারপুনের পেছনে দড়ি বাঁধা থাকে। নৌকার মধ্যে লাগানো বিরাট চরকির মতো হুইল থেকে দড়ি খুলতে থাকে। অনেক সময় আহত তিমির ঝটাপটিতে দড়ি ছিঁড়ে নৌকো উল্টে যেত। ১৮৬০ সালে স্‌ভেন্ড ফোয়েন বন্দুক থেকে ছোঁড়া যায় এমন হারপুন বানালেন। এর আগায় আবার বোমা লাগানো। এমন বন্দুক হারপুন হাতে নিয়ে কলের নৌকো বা জাহাজে চেপে তাড়া করলে তিমি পারবে কেন? তাছাড়া গত শতাব্দী থেকে গ্রীষ্মকালে শিকারীরা মেরু অঞ্চলে যেতে শুরু করল। খাবার যোগাড়ে আর বাচ্চা হবার জন্যে হাজার হাজার তিমি প্রতি বছর এইখানে এসে শিকারীদের হাতে প্রাণ দেয়।
দ্বাদশ শতাব্দীতে স্পেনের বাস্ক উপজাতির লোকেরা যেভাবে তিমি শিকার করত তার মধ্যে দুঃসাহস ছিল। এখনও পুরনো কায়দায় তিমি শিকার করে এসকিমোরা। উত্তর মেরু অঞ্চলের সমুদ্রের দারে তারা চটপট সীলের চামড়ার নৌকায় চেপে তাড়া করে। চৌখস শিকারী হলেও তারা কিন্তু আদিম মানুষ, বিশ্বাস করে। তিমি নিজে না ধরা দিলে কেউ তাকে ধরতে পারে না।
তিমির মাংস জাপানীরা ভালবাসে। সেখানে দুপুরে খাবার সঙ্গে স্কুলের ছেলে-মেয়েদের তিমির মাংস দেওয়া হয়। তিমি মাছ শিকার করার জাহাজ আর নৌকা, কাটাকুটি করার কারখানা, এককালে আমেরিকারই ছিল বেশি। এখন জাপানের। ষাট টন ওজনের তিমির মাংস আলাদা করে চর্বি গলিয়ে হাড় পিষে তেল বানিয়ে ফেলা যায় ঘণ্টাখানেকের মধ্যে। স্পার্ম জাতের তিমি শিকার করে অস্ট্রেলিয়া। স্পার্মের মাথার ঘিলু থেকে যে তেল বেরোয় তা কারখানার যন্ত্রপাতি চালু রাখার পক্ষে সবচেয়ে ভাল। সৌভাগ্যের বিষয় এখন জোজোবা বীন থেকে চমৎকার তেল তৈরী হচ্ছে। এর জন্যেই হয়তো স্পার্ম তিমি বেঁচে যাবে।
ভারী সুন্দর এই অতিকায় সামুদ্রিক দৈত্যগুলো। সফেন ঢেউয়ে লুটোপুটি খায়, হুটোপাটি করে। এখন নিশ্চিহ্ন হতে বসেছে। বহু দেশ তাই তিমি সংরক্ষণের জোর চেষ্টা চালাচ্ছে।

বানান অপরিবর্তিত রইল।

ল্যাংড়া আমের গল্প


ফুলের রানী গোলাপ আর ফলের রাজা আম। আমের জন্মস্থান এই ভারত। কোন কোন পণ্ডিতের মতে সিংহল। সিংহলকে এখন বলে ‘শ্রীলংকা’। আগে বলত শুধু ‘লংকা’। সেখানে তখন প্রচুর লংকা হত কিনা জানি না, কিন্তু আম যে হত, সে-কথার উল্লেখ আছে রামায়ণে।
রামায়ণের গল্প জান তো? পিতৃসত্য পালনের জন্য রাম গেলেন বনে, সঙ্গে গেলেন সীতা আর লক্ষ্মণ। লংকার রাজা রাবণ একদিন সীতাকে চুরি করে নিয়ে পালান। সীতা উদ্ধারের জন্য রাম মিতালি পাতালেন কিষ্কিন্ধ্যার রাজা সুগ্রীবের সঙ্গে। দেশে দেশে সুগ্রীবের বাহিনী ছুটল সীতার খোঁজে। হনুমান গেলেন লংকায়। তাঁর কাছে রামের খবর পেয়ে খুব খুশি হলেন সীতা। খেতে দিলেন একটি আম। হনুমান আম খাননি আগে। খেতে দারুণ ভাল লেগে গেল তাঁর। আরও খেতে সোজা হানা দিলেন রাবণের সাধের আম্রকুঞ্জে। ফলে হনুমানকে বেঁধে তাঁর লেজে আগুন দিয়ে দেওয়া হল। তারপর সেই আগুনে লংকাদাহ।
আম নিয়ে আরও এক মজার গল্প আছে। প্রাচীন ভারতের ঐশ্বর্যের কথা তখন লোকের মুখে মুখে। গজনির সুলতানের কানে গেল সেটা। সত্যি-মিথ্যে খোঁজ নিতে পাঠালেন উজিরকে। উজির বহু জায়গা ছদ্মবেশে ঘুরে দেখে ফিরে গেলেন গজনি। সুলতানকে ভারতের ঐশ্বর্যের বর্ণনা দিতে দিতে একসময় এলেন সে-দেশের ফলের কথায়। ‘‘হুজুর হিন্দুস্তানে দেখলাম এক আজব গাছ, এদেশের খেজুরের মত একপায়ে খাড়া। মাথার উপর ইয়া বড় বড় ফল। ঈশ্বরের কী দয়া। ঐ ফলের ভিতর রেখেছেন ভূখাদের জন্য দুখানা মিষ্টি রুটি আর এক লোটা মিঠা পানি।’’ বুঝতে পেরেছ আশা করি-উজির বলছিলেন আমাদের নারকেলের কথা। তারপর তিনি এলেন আমের প্রসঙ্গে। বললেন, ‘‘আমার অপরাধ মাফ করবেন। আমার এই পাকা দাড়িতে যদি গুড় আর পাকা তেঁতুল একসঙ্গে চটকে ঘন করে মাখি আর আপনি সেটা চুষতে থাকেন, তা হলে তখন যে স্বাদ পাবেন-ঠিক সেইরকম স্বাদের একটা ফল আছে হিন্দুস্তানে। হিন্দুস্তানীরা তাকে বলে আম।’’
আমের এমন বিচ্ছিরা বর্ণনা শুনে উজিরের উপর রাগ হয় আমাদের। হয় তাঁর বরাতে ভাল আম জোটেনি, নয়ত তখন ভাল আম ছিলই না এদেশে। নইলে উজিরের ঐ আমের সঙ্গে আমের সেরা ‘ল্যাংড়ার’ কি কোন তুলনা হয়?
সেই ল্যাংড়া আমের কথায় আসছি। কাশীর পেয়ারার মত কাশীর আমেরও বেশ নাম। অনেক দিন আগের কথা। তখন কাশীর বাজারে অনেক রকমের আম আসত। তার মধ্যে স্বাদে-গন্ধে সেরা একটা আম পাওয়া যায় মাঝে মাঝে। এই আম আসে এক খোঁড়া ভদ্রলোকের বাগান থেকে। অন্য আম ছেড়ে খরিদ্দারেরা ভিড় করেন এই আম কিনতে। তাই বাজারে এ-আমের চাহিদা খুব, দামও বেশী। খোঁড়াকে বলে ‘ল্যাংড়া’। ফিরিওয়ালা হেঁকে হেঁকে বিক্রি করে, ‘‘ল্যাংড়ার বাগানের আম কিনুন, ল্যাংড়ার বাগানের আম।’’
‘‘ল্যাংড়ার বাগানের আম’— মুখে মুখে ছোট হতে হতে এক সময় দাঁড়াল ‘‘ল্যাংড়া আম।’’ পরে আরও ছোট হয়ে ‘‘ল্যাংড়া’’। এটা অবশ্য গল্পই। সত্যি-মিথ্যা জানি না।
- – - – - – - – - – - – - – - – - – - – - – - – - – - – - – - – - – - –
বানান সব অপরিবর্তিত রইল
তৃতীয় বর্ষ, তৃতীয় সংখ্যা, আষাঢ়, ১৩৮৪।

কলকাতায় ডাইনোসর


এই সেই ডাইনোসর, যাকে নিয়ে বহু রূপকথা আর লোকগাথা তৈরি হয়েছে। প্রায় ৪৭ ফুট লম্বা ও দোতলা বাসের সমান উঁচু এই কঙ্কালটি পাওয়া গেছে ভারতের দক্ষিণ-পূর্বে গোদাবরীর উত্তর তীরে। নদীর তীরে এদিক-সেদিক ছড়িয়ে ছিল বিস্তর হাড়গোড়। জেলের ছেলেরা ওইসব হাড় নিয়ে খেলাধুলো করত। ১৯৫৮ সালে লন্ডন ইউনিভার্সিটির শ্রীমতী পামেলা এল রবিনসনের নেতৃত্বে ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিসটিকাল ইনস্টিটিউট গোদাবরীর তীরে একটি অনুসন্ধানকারী দল পাঠায়। তাঁরা ডাইনোসরের কঙ্কালটির অংশবিশেষ উদ্ধার করেন। ১৯৬০-৬১ সালে আর-একবার অনুসন্ধানের কাজ চলে। প্রচুর হাড় পাওয়া যায় সেবার। তিন ট্রাক ভর্তি হাড়ের ওজন হবে প্রায় দশ হাজার কিলোগ্রাম। হাড় এল কলকাতার ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিসটিকাল ইনস্টিটিউটে। ১৯৭৬-এর ডিসেম্বরে শ্রী প্রণবকুমার মজুমদার মাত্র ছয় সপ্তাহের মধ্যে সব হাড় ঠিক-ঠিক সাজিয়ে বিশালাকৃতি ডাইনোসরের কঙ্কালকে দাঁড় করিয়ে দিলেন। শ্রীমজুমদার মূলত একজন শিল্পী। অনুসন্ধানকারীদের দলে ইনিও ছিলেন। আমেরিকান মিউজিয়ামের প্রখ্যাত পুরাতত্ত্ববিদ ডঃ এডউইন এইচ কোলবার্ট এত অল্প সময়ের মধ্যে কঙ্কালটি জোড়া লাগাতে দেখে অবাক হয়ে যান। এই প্রথম ভারতবর্ষে ডাইনোসরের কঙ্কাল পাওয়া গেল। এর বয়েস হবে প্রায় ষোল কোটি বছর। বিশাল দেখতে হলে কী হবে, ডাইনোসর আসলে ছিল খুব ভিতু প্রকৃতির প্রাণী। মাংস খেত না, খেত শুধু গাছপালা। ডাইনোসরের এই কঙ্কালটির নাম রাখা হয়েছে ‘বরাপাসৌরস টেগোরী’। বরাপাসৌরস মানে বড় পা’ওলা গিরগিটি আর টেগোরী রাখা হয়েছে রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকীর সময় এটিকে পাওয়া গিয়েছিল বলে।

টিন! টিনের গল্প

না, টিনটিনের গল্প নয়, টিনের গল্প। টিন ধাতুর গল্প। তবে তাতে ক্ষতি নেই, টিনটিনের গল্পের মতোই রোমাঞ্চকর এই টিনের গল্প। একটা উলটোপালটা প্রশ্ন করি। ১৮১১ সালে রাশিয়া জয় করতে গিয়ে ফরাসী সম্রাট নেপোলিয়ান বোনাপার্টি কেন হেরে গিয়েছিলেন, জান কি? উত্তরে বলতে হয়, বিশ্ববিজয়ী সম্রাটের এই বিপর্যয়ের মূলেও টিনটিনের মতোই খামখেয়ালি স্বভাবের এই টিনের কিছু ভূমিকা ছিল। নেপোলিয়ানের সৈন্যদের পরনে ছিল ভারী গরম কোট, পায়ে ইয়া বুট। রাশিয়ার হাড়-কাঁপানো ঠান্ডার সঙ্গে পাঞ্জা লড়বার জন্য সরঞ্জামের অভাব ছিল না। কিন্তু ঘাটতি ছিল এক জায়গায়। সৈন্যদের গরম কোটের বোতাম ছিল টিনের তৈরি, যে টিন ১৩ ডিগ্রী সেনটিগ্রেড তাপমাত্রার নীচে রাসায়নিক পরিবর্তনের ফলে ‘ধূসর টিনে’ (গ্রে টিন) রূপান্তরিত হয়। এই ‘ধূসর টিন’ মুচমুচে বিস্কুটের মতোই ভঙ্গুর। ফলে রাশিয়ার প্রচণ্ড শীতে (যা শীতকালে হিমাংকের অনেক নীচে চলে যায়) নেপোলিয়ানের সৈন্যদের কোটের বোতাম ভেঙে চূরচূর। তারপর ঐ হিমঠান্ডায় ব্রংকাইটিস হয়ে মারা গেল প্রায় আদ্ধেক সৈন্য, বাকি যারা প্রাণে বাঁচল, তাদেরও আর যুদ্ধ করবার উৎসাহ বা শক্তি কিছুই অবশিষ্ট ছিল না। কোনরকমে পালিয়ে সে যাত্রা প্রাণে বাঁচল তারা। নেপোলায়ান সেবার যুদ্ধে হারলেন রসায়ন শাস্ত্রের এই সরল সত্যটির হদিশ রাখতেন না বলে।
যে টিনের খামখেয়ালিপনার জন্য নেপোলিয়ানের যুদ্ধে এমন পরাভব, তার প্রকৃতি কিন্তু এমনিতে খুব নমনীয়। একে পিটিয়ে ছাতু করে খুব পাতলা পরতে পরিণত করা অসম্ভব নয়। ভাঙা বাসনপত্র বা ধাতুর তৈরি খেলনাপত্র জুড়তে ঝালাইয়ের কাজে লাগলেও টিনের মূল ব্যবহার কিন্তু টিন প্লেট তৈরিতে। ইসপাতের পাতলা চাদরের ওপর তরল টিনের প্রলেপ লাগিয়ে তৈরী হয় টিন প্লেট। এই টিন প্লেটেই সারা পৃথিবীতে তৈরী হচ্ছে লাখো-লাখো টিনের কৌটো, যা আজ প্যাকিং শিল্পের মূল বুনিয়াদ। ওষুধপত্র থেকে শুরু করে রসগোল্লা প্যাকিংএ পর্যন্ত টিনের কৌটো লাগে। শিল্পী রঁদা বা হেনরি মূরের ভাস্কর্যের উপাদান যে ব্রোঞ্জ, তা প্রস্তুত করতে তামার সঙ্গে মিশেল দিতে হয় টিন। এই ব্রোঞ্জ তৈরির ইতিহাস ঘাঁটলে আমাদের চলে যাতে হবে ৩৭০০ খ্রীস্টপূর্বাব্দে। তৎকালীন মিশরের একটি ব্রোঞ্জের রড পরীক্ষা করে শতকরা প্রায় ৯ ভাগের মতো টিন পাওয়া গেছে। অর্থাৎ সেই প্রাচীন কালেও মানুষ আবিষ্কার করেছিল টিনের আকরিক, এই ধাতুটি ব্যবহার করতে শিখেছিল নিজের প্রয়োজনে। প্রাচীন ভারতের মহেনজোদড়ো এবং হরপ্পা থেকেও ব্রোঞ্জের তৈরি অলংকার, অস্ত্রশস্ত্রও পাওয়া গেছে।
প্রকৃতির উদার বুকের গভীরে কাঁচা টিন বিশুদ্ধ অবস্থায় মেলে না, যা মেলে তা হল টিনের প্রধান আকরিক ক্যাসিটেরাইট বা টিনস্টোন। রসায়নবিদের ভাষায় টিন অকসাইড অর্থাৎ টিন আর অকসিজেন গ্যাসের সমন্বয়। এতে টিনের পরিমাণ শতকরা ৭৯ ভাগের মতো। ক্যাসিরাইট দেখতে ঝকঝকে, শরীরের রং কখনো বাদামী, সবুজ বা লাল, আবার কখনো বা কালো। কাচের মতোই কঠিন, তবে দারুণ ভারী, জলের প্রায় সাতগুণ।
গলিত ম্যাগমা নিঃসৃত তপ্ত-জল-জাত ক্যাসিটেরাইটের আদি জন্মভূমি গ্র্যানাইট জাতীয় পাথর। তবে পৃথিবীর বড় বড় টিনের খনির অবস্থান নদীর অববাহিকা অঞ্চলে, যেখানে আদি জন্মস্থান থেকে উদ্বাস্তু হয়ে ক্যাসিটেরাইট আশ্রয় নিয়েছে। রোদ-জল-হাওয়ার সংস্পর্শে টিনসমৃদ্ধ গ্র্যানাইট বা আনুষঙ্গিক পাথরে ভাঙন ধরলে প্রকৃতির সাধারণ নিয়মেই ভারী টিনের আকরিক নদীনালার স্রোতের সঙ্গে পরিক্রমা করে খানিকটা পথ। তবে নিজের ভারী দেহের জন্য দীর্ঘ পথ পেরোতে পারে না। আড্ডার আসর জমায় জন্মভূমির অদূরেই। মালয়েশিয়ার টিনের খনিজ ভাণ্ডার, আয়তনে যা পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে বড়, তারও জন্ম এভাবেই। এই খনিজ ভাণ্ডার দৈর্ঘ্যে ১৬০০ কিলোমিটার এবং প্রস্থে ২০০ কিলোমিটারের কাছাকাছি। মালয়েশিয়া ছাড়াও বলিভিয়া, চীন ও ইংল্যান্ড টিন উৎপাদনে অগ্রণী।
ভারতে বড় আকারের খননযোগ্য টিনের খনিজ ভাণ্ডার না থাকলেও বিহারের রাঁচি হাজারিবাগ ও গয়া জেলা এবং গুজরাটের পালানপুর ও বনসকণ্ঠ জেলায় সামান্য কিছু ক্যাসিটেরাইটের সন্ধান মিলেছে। তবে এর কোনটিই আপাতত লাভজনক নয়। সুতরাং ভারতকে নিজের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাতে নির্ভর করতে হচ্ছে বিদেশ থেকে বাৎসরিক প্রায় দশ কোটি টাকার টিন আমদানির ওপর।
- – - – - – - – - – - – - – - – -
তৃতীয় বর্ষ, প্রথম সংখ্যা, বৈশাখ, ১৩৮৪ সাল।
বানান অপরিবর্তিত রইল।

গুরুদেবের ক্লাসে

আমাকে যখন কলকাতা থেকে শান্তিনিকেতনে নিয়ে গিয়ে গুরুদেব রবীন্দ্রনাথের ইশকুলে ভর্তি করে দেওয়া হয়, তখন আমার বয়স খুব অল্প। মা-বাবাকে ছেড়ে দূরে থাকতে প্রথম-প্রথম খুব কষ্ট হত। কিছুদিন বাদেই কিন্তু অনেক বন্ধুবান্ধব পেয়ে যাই। তখন আবার ছুটিতে কলকাতায় এসে দু’চার দিন বাদেই ভীষণ হাঁফিয়ে উঠতাম। কলকাতার জীবন তো একেবারে বদ্ধ জীবন। মাঠ নেই, গাছপালা নেই, পার্ক গোটাকয় আছে বটে, কিন্তু তাতে বড্ড ভিড়, রাস্তার উপরেও লোক গিজগিজ করছে, হাঁটতে গেলে ধাক্কা লাগে। তাই কলকাতায় থাকতে একটুও ভাল লাগত না। খালি মনে হত, কবে আবার সেই খোলামেলা জায়গায় ফিরে যাব।
শান্তিনিকেতনে আমাদেরও ক্লাস নেওয়া হত গাছতলায়। ইশকুলকে তাই ঠিক ইশকুল বলে মনে হত না। গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ তখন দ্বারিক-বাড়িতে থাকতেন। ক্লাসে বসেই কখনো-কখনো আমরা দেখতে পেতুম যে, গুরুদেব সেই বাড়ি থেকে বেরিয়ে শালবীথির ভিতর দিয়ে আনমনে হাঁটতে-হাঁটতে লাইব্রেরির দিকে চলেছেন। যেতে-যেতে তিনি থেমে দাঁড়াতেন, তারপর মাষ্টারমশাইকে জিজ্ঞেস করতেন যে ক্লাসটা কিসের। যদি শুনতেন যে, বাংলা, ইংরেজী কি ইতিহাসের, তাহলে অনেক সময় বলতেন, “আচ্ছা, তাহলে আজকের এই পড়াটা আমিই বুঝিয়ে দিচ্ছি।” আমার মনে আছে যে, ইতিহাসের ক্লাসে তিনি খুব সুন্দর করে একদিন প্রাচীন মিশরের সভ্যতার কথা আমাদের বুঝিয়ে দিয়েছিলেন। সেই প্রসঙ্গে এমন অনেক কথা সেদিন তিনি বলেছিলেন, আমাদের পাঠ্যপুস্তকে যার উল্লেখ ছিল না। কবিতার ক্লাস হলে তো কথাই নেই, এমনভাবে তিনি কবিতাটি দু’তিনবার পড়ে শোনাতেন যে, তাইতেই যেন তার ভিতরকার অর্থ অনেকটা পরিষ্কার হয়ে যেত। একদিন পড়িয়েছিলেন নিজের লেখা ‘পণরক্ষা কবিতাটি। এমনভাবে পড়িয়েছিলেন যে, আমাদের মনে হয়েছিল, গোটা দৃশ্যটা যেন চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি। দুর্গেশ দুমরাজের জন্য যে খুব কষ্ট পেয়েছিলুম, তাও মনে আছে।
আরও একটু বড় হবার পর আমাদের সাহস অনেক বেড়ে গেল। তখন অনেকদিন তাঁর বাড়িতে গিয়েও হানা দিয়েছি। না, পড়া বুঝে নেবার জন্য নয়, ডাকটিকিটের লোভে। কিন্তু ডাকটিকিটের গল্প বরং আর একদিন বলব, আজ শুধু পড়া বুঝে নেওয়ার গল্পটাই বলি। মজা এই যে, পড়া বুঝে নেওয়ার জন্যেও আমরা একদিন গুরুদেবের বাড়িতে গিয়ে হানা দিয়েছিলুম।
১৯২৫ সালের কথা। তখন আমি দশম শ্রেণিতে পড়ি। পরের বছর ম্যাট্রিক পরীক্ষা দেব, তাই পড়াশুনোর খুব চাপ চলছিল। তার উপরে আবার আমরা কয়েকজন ইংরেজীতে একটু পিছিয়ে পড়েছিলুম। সেইজন্য আমরা গ্রীষ্মের ছুটিতে অন্যদের মতো শান্তিনিকেতন ছেড়ে বাড়ি যেতে পারিনি। আমাদের বলা হয়েছিল, “বাড়ি গেলে তো আমোদ-আহ্লাদ করে ছুটি কাটাবে, পড়াশুনো ঠিকমতো হবে না। তার চেয়ে বরং বোর্ডিংয়েই থেকে যাও, মাষ্টারমশাইরা তোমাদের সাহায্য করবেন, তোমরাও তার ফলে ইংরেজীর গলদটা চটপট ঝালাই করে নিতে পারবে।”
বোর্ডিং দেখতে-দেখতে ফাঁকা হয়ে গেল। রয়ে গেলুম শুধু আমরা দু-চারজন পরীক্ষাথীর্। আর রইল সেইসব বন্ধু, যারা শান্তিনিকেতনেরই বাসিন্দা। সারাদিন যে যার ঘরে নিজে-নিজে পড়তুম। তারপর সন্ধ্যার দিকে দল বেঁধে যেতুম আমাদের ইংরেজীর শিক্ষক শ্রীপ্রমদারঞ্জন ঘোষ মশাইয়ের বাড়িতে। যাতে আমাদের ইংরেজীর গলদটা মেরামত হয়ে যায়, তার জন্য তাঁর চেষ্টার অন্ত ছিল না। লণ্ঠনের চারপাশে গোল হয়ে আমরা বসতুম। ঘণ্টার-পর-ঘণ্টা তিনি পড়িয়ে যেতেন। ঘুমে আমাদের চোখের পাতা জড়িয়ে আসত, অনেক সময় তিনি নিজেও ঢুলতে থাকতেন। কিন্তু সে-কথা বললেই তিনি রেগে যেতেন খুব। বলতেন, “আমার কষ্টের কথা তোদের ভাবতে হবে না, নিজেরা ঠিকমতো লেখাপড়া শিখে মানুষ হ দেখি।”
কিন্তু, মানুষ হতে গিয়ে আমাদের তো প্রাণান্ত হবার উপক্রম। গ্রামার, ট্রানস্লেশন, সামারি, সাবসট্যান্স, প্রিসি রাইটিং-পড়ছি তো পড়ছিই, লিখছি তো লিখছিই। তার উপর আবার ইংরেজী কবিতা তখনও বাকী রয়েছে।
ঠিক সেই সময় আমার মাথায় একটা বুদ্ধি খেলে যায়। বন্ধুদের বলি, “দ্যাখো, এখানে আর কবিতা পড়ে কাজ নেই।”
অবাক হয়ে তারা বলল, “তাহলে কোথায় পড়ব?”
আমি বললুম, “গুরুদেবের কাছে। ক্লাসে তো মাঝে মাঝে তিনি আমাদের কবিতা পড়িয়েছেন। এবার চলো, পরীক্ষার পড়াটাও তাঁর কাছেই বুঝে নেব।”
যে কথা, সেই কাজ। গুটিগুটি আমরা একদিন সকালবেলায় গুরুদেবের কাছে গিয়ে হাজির হলুম। আমরা মানে, আমি, লাবু (অর্থাত্‌ স্বর্গত ক্ষিতিমোহন সেন মশাইয়ের মেজো মেয়ে মমতা), অমিতা (অর্থাত্‌ বিখ্যাত সাহিত্য সমালোচক স্বর্গত অজিত চক্রবর্তী মশাইয়ের মেয়ে), তাপসী দাশ (ইনি ঢাকা থেকে এসেছিলেন) এবং আরও কয়েকজন।
গুরুদেব আমাকে কানাই বলতেন না। তিনি আমার নাম দিয়েছিলেন শ্যামের বাঁশি। আমাদের দেখে বললেন, “কী খবর শ্যামের বাঁশি? হঠাত্‌ দলবল নিয়ে এই সকালবেলায় এসে হানা দিয়েছ যে? ডাকটিকিট চাই বুঝি?”
আমি বললুম, “না। আমরা পড়তে এসেছি। পরীক্ষার আর দেরি নেই। ইংরেজী কবিতাটা আপনি আমাদের একটু বুঝিয়ে দিন।”
শুনে গুরুদেব বললেন, “ও। তা আমার বুঝি অন্য কোনও কাজ নেই?”
আমরা বললুম, “যতই কাজ থাক, আমাদের পড়াতেই হবে।”
আমাদের জেদ দেখে গুরুদেব হেসে ফেললেন, বললেন, “কী বই পড়িস তোরা?”
তখন আমাদের পরীক্ষা নিতেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়। তাঁদের প্রকাশিত বই-ই আমাদের পড়তে হত। ইংরেজী কবিতার সেই বইখানা আমরা গুরুদেবের হাতে তুলে দিলুম। তিনি সেখানা উল্টেপাল্টে দেখে নিয়ে বললেন, “এতে চলবে না। আমি বরং প্যালগ্রেভের গোল্ডেন ট্রেজারি থেকে কিছু কবিতা তোদের পড়িয়ে দিই। তাতে তোদের ভিতটা তৈরি হয়ে যাবে। তখন তোরা এই পাঠ্যপুস্তকের কবিতাগুলি নিজেরাই বুঝে নিতে পারবি।”
ব্যস, শুরু হয়ে গেল আমাদের কবিতার ক্লাস। দিন কয়েক বাদে আমাদের বন্ধু শান্তিদেবও (শান্তিদেব ঘোষের নাম তো তোমরা সকলেই শুনেছ) সেই ক্লাসে এসে যোগ দিল। ক্রমে-ক্রমে রটে গেল যে, গুরুদেব খুব সুন্দর করে ইংরেজী কবিতা বুঝিয়ে দিচ্ছেন। তখন মাষ্টারমশাইরাও আসতে শুরু করলেন। কলকাতা থেকে রামান্দ চট্টোপাধ্যায় মশাই শান্তিনিকেতনে এসেছিলেন। তিনিও তখন নিয়মিতভাবে সেই ক্লাসে এসে হাজিরা দিয়েছেন।
গুরুদেব যে কী সুন্দর করে কবিতা পড়াতেন, তা বুঝিয়ে বলতে পারি, এমন সাধ্য আমার নেই। যে কবিতাটি পড়াচ্ছেন, প্রথমে তিনি বারকয়েক সেটি পড়ে শোনাতেন। তারপর কঠিন-কঠিন শব্দগুলির মানে বলে দিতেন। তারপর, খুব সংক্ষেপে, বুঝিয়ে দিতেন তার তাত্‌পর্য। শেষে বলতেন, “যা বুূঝেছিস, তোরা নিজেদের ভাষায় সেটাকে লিখে আমাকে দেখা।”
কলকাতায় ফিরে এসে প্রবাসী পত্রিকায় এই ক্লাস সম্পর্কে রামানন্দবাবু একটা সম্পাদকীয় মন্তব্য লিখেছিলেন। কিন্তু সে-কথা থাক। আজ বরং বলি যে, গুরুদেবের সেই ক্লাস সে সময়ে শান্তিনিকেতনে কী উত্‌সাহের সৃষ্টি করেছিল। ছাত্রীদের সঙ্গে অনেক সময় তাদের মায়েরাও আসতেন। আমার সঙ্গে যেতেন দিন্দা, অর্থাত্‌ দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর। গুরুদেব যখন আমাকে কোন প্রশ্ন করতেন, তখন উত্তর জানা সত্ত্বেও অনেক সময় আমি কুণ্ঠা কাটিয়ে কিছু বলতে পারতুম না। পিছন থেকে দিন্দা তখন আমাকে উত্‌সাহ জোগাতেন। দিন্দা বলতেন, “অন্যদের অভিভাবকরাও তো উত্‌সাহ জোগান। তোকে কে উত্‌সাহ জোগাবে? আমি সেইজন্য আসি।”
তবু একদিন বিপদে পড়তেই হল। বিকেলবেলায় আমরা জনাকয় ছাত্র যখন ক্লাসে যাচ্ছি, তখন রথীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে দেখা। তিনি বললেন, “কাল এখানে মহাত্মা গান্ধী আসছেন। তাঁকে অভ্যর্থনা করবার জন্যে ফুল চাই। তোমরা কজনে সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়ো। শান্তিনিকেতনের ধারে কাছে যত পুকুর পাবে, তার থেকে পদ্মফুল তুলে আনবে। আমরা ঠিক করেছি মহাত্মাজীর থাকবার ঘরটা শুধু পদ্মফুল দিয়ে সাজিয়ে দেব।”
ক্লাস করা আর হল না। সাইকেল নিয়ে আমরা পদ্মফুলের সন্ধানে বেরিয়ে পড়লুম।
পরদিন ক্লাসে গিয়ে দেখি গুরুদেবের মুখে হাসি নেই। তার উপর আবার ভৃত্যকে ডেকে এমনভাবে তাঁর ইজিচেয়ারটাকে তিনি ঘুরিয়ে নিলেন, যাতে ছেলেদের মুখ তাঁকে আর না দেখতে হয়। আমরা তো বিপদ গনলুম। ব্যাপার কী? আমরা কি কোনও দোষ করেছি?
গম্ভীর গলায় গুরুদেব বললেন, “ঠিক করেছি, এখন থেকে শুধু মেয়েদেরই আমি পড়াব। ছেলেদের আর পড়াব না।”
রুদ্ধ গলায় প্রশ্ন করলুম, “কেন?”
গুরুদেব বললেন, “কাল তোমরা ক্লাসে আসোনি কেন?”
আমি বললুম, “রথীদা আমাদের পদ্মফুল জোগাড় করতে পাঠিয়েছিলেন।”
“সে-কথা আমাকে জানিয়ে যাওনি কেন?”
এর পর কী জবাব দেব? বুঝতে পারছিলুম, অন্যায় হয়ে গেছে। কিন্তু তাই বলে তিনি আমাদের ক্ষমা করবেন না?
ক্লাসের শেষে লাবু আর অমিতা বলল, “গুরুদেব তো খুব ফুল ভালবাসেন। তোমরা কালকে ক্লাসে আসবার সময় ফুল নিয়ে এসো। তাহলে নিশ্চয় রাগ পড়ে যাবে।”
শান্তিনিকেতনের বাড়ি-বাড়ি গিয়ে সেবার আমরা বেল ফুল জোগাড় করি। মেয়েরা রাত জেগে সেই ফুল দিয়ে সাড়ে ছ ফুট লম্বা একটা মালা বানিয়ে দেয়। পরদিন একটা থালার উপরে সেই মালা সাজিয়ে আমরা ক্লাসে যাই।
ব্যস্, গুরুদেবের মুখে আবার হাসি ফুটে উঠল। আবার শুরু হয়ে গেল কবিতার ক্লাস।

কুকুর মানুষ করতে হলে

kukurবাঁ-দিকের ওই কুকুরটাকে দেখ, দেখেছ জ্বলন্ত রিংয়ের ভেতর দিয়ে কী চমত্‌কার লাফ দিচ্ছে! এমনভাবে লাফ দিচ্ছে যে, আগুন ওর গায়ে একটুও লাগছে না। শুধু জ্বলন্ত রিংয়ের ভেতর দিয়ে লাফ দেওয়া নয়, আরও অনেক কিছুই পারে ও। ওকে বসতে বললে বসে, সঙ্গে হাঁটতে বললে হাঁটে, দৌড়তে বললে দৌড়য়, ছুটে গিয়ে বল এনে দেয়। কিছুদিন হল ও গন্ধ শুঁকে শুঁকে চোর-ডাকাত ধরতে শিখেছে। অথচ ওর এখন এক বছরও বয়েস হয়নি। এইটুকু বয়েস, কিন্তু চেহারা দেখলে ভয় লাগে না? ভয় পাওয়াবার মতো চেহারা হলে কী হবে, দুষ্টুমি না-করলে ও কাউকে কিচ্ছু বলে না। ওর নাম গোল্ডি। গোল্ডি বলে ডাকলে ঠিক কান খাড়া করে তাকাবে। গোল্ডির মাস্টারমশাইয়ের নাম টি ঘোষাল। তিনি একজন ডগ ট্রেনার, সপ্তাহে দুদিন করে ওর ক্লাস নিয়েছেন। গোল্ডির মাথা খুব ভাল তো, অল্প দিনের মধ্যে অনেক কিছু শিখে গেছে। তোমরা নিশ্চয়ই কুকুর ভালবাসো, অনেকের বাড়িতেই হয়ত কুকুর আছে, কিন্তু কী করে কুকুর মানুষ করতে হয় জান? ছোট্ট একটা কুকুরের বাচ্চা বাড়িতে এনে প্রথমেই তার নাম রাখবে। নামটাও ছোট হওয়া দরকার, নাহলে কুকুরের পক্ষে ওর নাম বুঝতে অসুবিধে হবে। ধরো, তুমি কুকুরের নাম রাখলে প্রদ্যুম্ননারায়ণ কিংবা ম্যাকডোনালড, তাহলে নাম শিখতে-শিখতেই ওর বয়েস বেড়ে যাবে। কিন্তু যদি নাম রাখ আন্না কিংবা টনি, তাহলে ও চটপট শিখে যাবে। কয়েকদিন একই নাম ধরে ডাকলে ও ঠিক মুখ ঘুরিয়ে তাকাবে, তারপর ছুটে আসবে তোমার কাছে। কুকুরকে শিক্ষিত করতে গেলে প্রথমেই দরকার ভালবাসা। ওরা আদর, বকুনি সব বুঝতে পারে। যদি শুধু-শুধু মারধর করো, ওরা ভয় পেয়ে যাবে, কিচ্ছু শিখবে না, পালিয়ে-পালিয়ে বেড়াবে, এমন কী রেগেও যেতে পারে। কুকুরকে বসিয়ে দিয়ে বলবে, ‘বোসো।’ একই কথা কিন্তু রোজ বলতে হবে। একদিন বলবে ‘বোসো’, আর একদিন বলবে ‘বোসো’, তার পরদিন বলবে‘বসবি তো’এরকম করলে চলবে না। ‘বোসো, ছোটো, দাঁড়াও’এইভাবে এক-এক কাজের জন্যে ঠিক একই ধরনের আদেশ দিতে হবে। একটা শেখা হয়ে গেলে আর-একটা শেখাবে, একসঙ্গে তিনটে শেখাতে গেলে কোনোটাই শিখতে পারবে না। ছোটরা কোনো কাজ ঠিক-ঠিক করতে পারলে কিংবা নতুন কিছু শিখলে বড়রা যেমন আদর করে, উপহার দেয়, কুকুরদের বেলাতেও নাকি তেমন করা উচিত। এতে ওদের উত্‌সাহ বাড়ে। ধরো, তোমার কুকুর তুমি যা বললে তাই করল, তুমি তখন ওর গায়ে-পিঠে হাত বুলিয়ে আদর করবে, কিংবা একটা বিস্কুট উপহার দেবে। এতে কী লাভ হবে জানো, পরের বার ও খুব মন দিয়ে তোমার কথা শুনবে, যা করতে বলবে তাই করবে। কুকুরের মাস্টারমশাইরা বলেন, কুকুরের মধ্যে প্রথমেই যে-জিনিসটা জাগিয়ে তুলতে হবে, সেটা হল আত্মবিশ্বাস। আত্মবিশ্বাস না থাকলে মানুষরা কিচ্ছু করতে পারে না, কুকুরদের বেলাতেও কথাটা খাটে। যে-কুকুর তুমি পুষতে তার ওপর তোমার ষোলো আনা মায়া-মমতা থাকা দরকার। সে একদিকে হবে তোমার ছাত্র, অন্যদিকে হবে তোমার খেলার সঙ্গী। শুধু তুমি ভালবাসলেই চলবে না, তোমার বাড়ির লোকদেরও তাকে অল্প-বিস্তর ভালবাসতে হবে, যাতে সে বুঝতে পারে সেও বাড়ির একজন। ব্যস, এইভাবে থাকলেই তার আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়ে যাবে। অবশ্য দরকারমতো তাকে শাসনও করতে হবে, নাহলে অতিরিক্ত আদর পেয়ে মানুষ হবার বদলে তোমার কুকুর আস্ত বাঁদর হয়ে যাবে। কুকুর তোমার বেশি বাধ্য হবে যদি তুমি ওকে নিজের হাতে খেতে দাও, নিজে ওর গা ব্রাশ করে, শেকল দিয়ে বেঁধে রাখো এবং শেকল খোলার কাজও করো নিজের হাতে। নানা জাতের কুকুর হয়। যেমন অ্যালসেশিয়ান, হাউনড্, ফক্স টেরিয়ার, সিডনি সিলকি, কেরি ব্লু, ককার, সেটার, স্প্রিংগার, গোলডেন রিট্রিভার, লাব্রাডরকত আর নাম বলব, তবে সবাই এরা সাহেব-কুকুর। দেশী কুকুরদেরও শুনেছি অনেক বুদ্ধি, যত্ন নিয়ে শেখালে এরাও অনেক কিছু শিখতে পারে। কুকুরদের সাধারণত দুভাবে শিক্ষিত করা হয়। এক, বাড়ির পোষা কুকুর ; দুই, শিকারী কুকুর। শিকারী কুকুররা শিকারীদের সঙ্গে শিকার করতে যায়। বুনো শুয়োর, হরিণ, এমন কী অনেক সময় ছোটখাট বাঘকেও এরা তাড়া করে শিকারীর বন্দুকের সামনে নিয়ে আসে। গুলি করে মারা পাখিও কুড়িয়ে নিয়ে আসে জঙ্গল কিংবা জলা থেকে। সমস্তরকম বিপদ থেকে শিকারীদের প্রাণ দিয়ে বাঁচাবার চেষ্টা করে। কুকুররা ভীষণ প্রভুভক্ত হয়। প্রভুভক্তি নিয়ে হাজার রকম গল্প আছে, তোমরা নিজেরাও অনেক গল্প জানো। পৃথিবীর বহু বিখ্যাত লোকের কুকুর-প্রীতি ছিল, এখনও অনেকের আছে। এঁদের মধ্যে অনেকে আবার নিজেদের কুকুর সম্পর্কে দু-চার কথা লিখেও গেছেন। প্রখ্যাত ফরাসী মনীষী ও গ্রন্থকার রমাঁ রল্যাঁ তংার ‘জাঁ ক্রিসতফ’ বইতে এই প্রসঙ্গে লিখেছেন, “শুধু মাত্র প্রভুদের শিক্ষাতেই পোষা প্রাণীরা ভাল বা মন্দ, সরল বা কুটিল, স্পর্শকাতর বা বোকা হয়ে ওঠে না, তারা আসলে হয়ে ওঠে ঠিক তাদের প্রভুদের মতো।” বেশ মজার কথা, তাই না? এ-কথাটার কিন্তু দুটো মানে আছে। একটা মানে তো তোমরা বুঝতেই পেরেছ, আর একটা বুঝতে পারবে যখন বড় হবে।
- – - – - – - – - – - – - – - – - – - – - ডিসেম্বর, ১৯৭৬ – - – - – - – - – - – - – - – - – - – - -

ছবি: রৌদ্র মিত্র

বাড়ির মধ্যে চিড়িয়াখানা

ভোর পাঁচটা নাগাদ ট্রেনটা এসে দাঁড়াল যশিডি স্টেশনে। যশিডির ঘুম তখনো ভাঙেনি, কিন্তু স্টেশনের বাইরে টাঙ্গাওয়ালারা দেখলাম খুবই সজাগ এবং তত্‌পর। সামনে-পিছনে প্রচণ্ড ডাকাডাকি হাঁকাহাঁকির মধ্যে একটি টাঙ্গা বেছে নিয়ে তাকে গন্তব্যস্থান বলতেই টাঙ্গাওয়ালার ভ্রূ কুঁচকে গেল। বললে, “ইতনা সুবে সুবে আপলোগ উঁহা যাকে ক্যা করেঙ্গে। উও চিড়িয়াখানা সামকো চার সে ছে তক্ খুলা রহতা।” এবারে তো আমার ভ্রূ কুঁচকে যাবার পালা বিস্ময়ের ধাক্কায়। যেতে চাইলাম আমার গন্তব্যস্থানে, আর টাঙ্গাওয়ালা কিনা আমাকে ভেবে নিল চিড়িয়াখানার যাত্রী! যাই হোক, আপাতত তো গন্তব্যস্থলে যাওয়া যাক। পথে যেতে যেতে টাঙ্গাওয়ালাকে জিজ্ঞেস করলাম, “যশিডি তো এই এতটুকু জায়গা, এখানে আবার চিড়িয়াখানা এল কোত্থেকে?” টাঙ্গাওয়ালা জবাব দিলে, “আপলোক যিস বাংলোমে যাতেহেঁ, ওহি বাংলোকা বাবু নে এক চিড়িয়াখানা বানায়া,” বলতে বলতে চাবুকসমেত হাতটা তুলে দেখিয়ে দিলে, উধার দেখিয়ে, ওহি হ্যায় চিড়িয়াখানা।” দেখলাম, ওদিকে গাছের মাথায় ঝোলানো ছোট্ট একটি বোর্ডে লেখা আছে, চিড়িয়াখানা। বিকেল চারটে নাগাদ ওই সাইনবোর্ডের নীচ দিয়ে ঢুকলাম চিড়িয়াখানায়। বেশ ছোটখাট একটা ভিড় জমেছে চিড়িয়াখানা দেখতে। ওই চিড়িয়াখানার জন্মবৃত্তান্ত শুনলাম। এটা এক বাঙালী ভদ্রলোকের শখের ব্যাপার। নাম দ্বারিক মিত্র। মিত্তিরমশাই অনেক টাকাপয়সা ব্যয় করে, অনেক মেহনত করে নানা অঞ্চল থেকে পশুপাখি সংগ্রহ করে তাঁর এই শখের চিড়িয়াখানাটি বানিয়েছেন। উনি এক পয়সাও দর্শনী নেন না দর্শনার্থীর্দের কাছ থেকে। দর্শনার্থীর্র ভিড়ে আমিও নিজেকে মিশিয়ে দিলাম। প্রথমেই নজরে পড়ল খাঁচার মধ্যে ভারী সুন্দর দেখতে কয়েকটা টিয়া। নাম, ডেরবিয়ান প্যারাকেট। হঠাত্‌ চমকে উঠলাম। একটা বাচ্চা ছেলে যেন কোথা থেকে চেঁচিয়ে উঠল, কে গো-কে গো? ওই আওয়াজের উত্তরে আমাদের সামনের খাঁচার মধ্যে থেকে একটা সাদা কাকাতুয়া কী যেন বিড়বিড় করে বকে গেল। ওর বিড়বিড় করে বকে গেল। ওর বিড়বিড়ানি থামতে না-থামতেই আবার সেই কচিকণ্ঠ, কে গো-কে গো? এতক্ষণে ব্যাপারটা বোধগম্য হল। বাচ্চা ছেলের আওয়াজ আসছে টিয়াপাখির কণ্ঠ থেকে। ওই টিয়া ও কাকাতুয়ার মধ্যে কথাবার্তা বেশ কিছুক্ষণ চলল। একটু এগোতেই দেখতে পেলাম নানা রঙের একঝাঁক সেনিগাল প্যারট। হলদে, সবুজ, লাল-সবুজে মাখামাখি। তাদের পাশাপাশি সাত-আট রকমের ম্যাকাও পাখি। তাদের মধ্যে কোন-কোনটার মুখ বাঘের মত। শুনলাম একটি ম্যাকাও নাকি একবার ডিমও পেড়েছিল, কিন্তু বাচ্চা ফোটেনি। এ ছাড়া আছে নানা রকমের কাকাতুয়া। কোনটা সাদা, কোনটা গোলাপী। পূর্ব এশিয়ার যাদের জন্ম সেই গোলডেন ফ্যাজেন্টার দেখা পেলাম এই চিড়িয়াখানায়। তার প্রতিবেশী হিসেবে রয়েছে হিমালয়ান কাঠবেড়ালি, শিম্পাঞ্জী আর একপাল খরগোশ। এই খরগোশগুলি মিত্তির মশাইয়ের খুব প্রিয়। উনি যখন এখানে থাকেন তখন ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের সঙ্গে বাজি ধরেন খরগোশ ধরার ব্যাপারে। আজ পর্যন্ত কেউ একটাও খরগোশ ধরতে পারেনি। ভারি চালাক ওরা। ধরতে গেলেই টুপটাপ লুকিয়ে পড়ে গর্তের মধ্যে। একজোড়া ডোরাকাটা কচ্ছপও দেখলাম এখানে। আর আছে মিত্তিরমশাইয়ের খুব প্রিয় একটি বাঁদর। নাম, সাহেব। দর্শনার্থীর্দের হাত ধরে নির্ভয়ে ঘুরে বেড়ায় সাহেব। মেজাজ ভাল থাকলে ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের গালে টুক করে একটি চুমু খেয়ে আদরও করে। দুধসাদা ময়ূর আছে এখানে। রঙীন ময়ূরও আছে। পেখম তুলে মনের আনন্দে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ওর দেখাদেখি পালক ফুলিয়ে পাখনা মেলে ঠিক যেন পেখম তোলার অনুকরণ করছে একটি টারকি কক। তার ধারণা সেও ময়ূরের মত পেখম তুলতে পেরেছে। মুখের ভাবটা খুব গম্ভীর-গম্ভীর। না, এই চিড়িয়াখানায় বাঘ সিংহ নেই। বাঘের বাচ্চা একটা আনা হয়েছিল একবার, কিন্তু টেঁকেনি, মারা গেছে। তবে হরিণ আছে বেশ কয়েকটা। দুই ধরনের। স্পটেড ডিয়ার আর বার্কিং ডিয়ার। খোলা জায়গায় নির্ভয়ে ঘুরে বেড়ায়। চিড়িয়াখানা দেখা শেষ করে বেরিয়ে আসছি, হঠাত্‌ একটা বাচ্চা হরিণ পিছন থেকে এসে ঢুঁসো মেরে পালাল। বুঝতে পারলাম না ওর উদ্দেশ্যটা কী! ও কি বিদায় সম্ভাষণ জানিয়ে গেল, নাকি রাগ দেখিয়ে বলল, যাও এবার!
- – - – - – - – - – - – - – - – - – - – -
দ্বিতীয় বর্ষ, অষ্টম সংখ্যা, অগ্রহায়ণ, ১৩৮৩ সাল।
বানান অপরিবর্তিত রাখা হল