issue_cover
x
Featurelist detail

z আজব দেশে
সুনীল দাশ

সামনে ওই মস্ত হাঙরটার মুখোমুখি এসে পড়ে গাড়ির আর-সব ছেলেমেয়ের সঙ্গে ঋকও চেঁচিয়ে উঠল।
আমরা গিয়েছিলাম পৃথিবীর সব চাইতে বড় ফিল্ম স্টুডিও ‘‘ইউনিভার্সাল’’ দেখতে। হলিউডের নাম ঋক তার ভূগোল বইতে পড়েছে, তাই এখানে আসার কথা পাকা হলে ও আনন্দে লাফিয়ে উঠেছিল। একটু আগেই স্টুডিওর গাড়ি চেপে যখন আমরা ওই কৃত্রিম সমুদ্রের পাশ দিয়ে আসছিলাম, নীল জলের ধার ঘেঁষে আস্তে আস্তে এগোচ্ছিল আমাদের গা়ড়িটা, তখন ঋকই বলেছিল, ‘‘ওই দেখো ছোটকাকু, জলের মধ্যে ছোট্ট একটা বোট নিয়ে সাহেবটা কেমন মাছ ধরছে।’’
ডাঙা থেকে একটু দূরে একাগ্রমনে ছিপ হাতে বোটের ওপর বসে ছিল সাহেবটি। একটুও নড়ছিল না। হঠাৎ জলে ঢেউ উঠল। ঘাই দিয়ে উঠল কী যেন একটা। জল দুলে উঠে উলটে দিল বোটটাকে। চোখের পলকে সাহেব চলে গেল জলের মধ্যে, আর সেই সঙ্গে বোটটার কাছে খানিকটা নীল জল— জলের মধ্যে চাপ-চাপ রক্ত মিশলে যেমন দেখায়— তেমন হয়ে উঠল। আমরা যখন একদৃষ্টে তাকিয়ে ছিলাম তখন আচমকা জলের একেবারে ধারে এসে আমাদের গাড়িটা কাত হয়ে পড়ল। জল তোলপাড় করে গাড়ির জানলার কয়েক হাতের মধ্যে উঠে এল বিশাল একটা হাঙরের হাঁ-মুখ। ঋক কাঁদেনি, কিন্তু অনেকগুলো ছেলেমেয়ে এক সঙ্গে কেঁদে উঠল গাড়ির মধ্যে। চব্বিশ ফুট লম্বা ওই হাঙরটার একেবারে দাঁতের নাগালে এসে পড়ে আঁতকে ওঠেনি এমন লোক গাড়িতে একজনও ছিল না।
অথচ, মোটামুটি সবাই জানে, জল ঠেলে উঠে আসা ওই হাঙরটা সত্যিকারের নয়। ওটা ‘জ’ (Jaw) নামে একটা চলচ্চিত্রের জন্যে বানানো যান্ত্রিক হাঙর। আর বোটে-বসা মাছধরার লোকটাও যে সত্যিকারের মানুষ নয়, খানিক পরেই বোঝা গেল ভাল করে। পুরো ব্যাপারটাই সাজানো। এর পরেই হাঙরটা আবার ডুবে গেল। আমাদের কাত হয়ে যাওয়া স্টুডিওর গাড়িটা আবার সোজা হল। আর, জলের মধ্যে ছোট সেই বোটটা ভেসে উঠল আবার। সাহেবটি মাছ ধরতে লাগল আগের মতো।
চমকের পালা চলছে একের পর এক। সারা দুনিয়া থেকে দর্শক আসে এই স্টুডিও-শহর দেখতে। বেশি মজা পায় ছোটরা। ১৯৭৬ সালেই ৩০ লক্ষ দর্শক ছুটে এসেছে এখানে পৃথিবীর নানা জায়গা থেকে।
ইউনিভার্সাল সত্যিই তুলনাহীন। পাহাড়ের কোলে চারশো একরের বেশি জায়গা নিয়ে গড়ে ওঠা এই কৃত্রিম স্টুডিওর মধ্যে পাওয়া যাবে না এমন জিনিস নেই। কৃত্রিম সমুদ্র, হ্রদ, জলপ্রপাত, শতশত প্রাসাদ, আধুনিক এবং মধ্যযুগের শহর, গঞ্জ, তুষারাঞ্চল, মাইলের পর মাইল রাস্তা, নিজস্ব রেলপথ, ডাকঘর, ব্যাঙ্ক, ফায়ারব্রিগেড— সবই আছে।
লস এঞ্জেলেসে এসে চওড়া-চওড়া সুন্দর সাজানো রাস্তা দেখে খুব ভাল লেগেছে ঋকের। পাশাপাশি ছটা গাড়ি যেতে পারে, আসতে পারে আরও ছটা একসঙ্গে। এগুলোর নাম ফ্রী ওয়ে। রাস্তা পারাপার করার জন্যে যে আলো জ্বলে তাতে লেখা থাকে, ‘‘Walk’’ কিংবা ‘‘Dont walk’’। সেই রকম একটা রাস্তা ধরে সান্তামনিকা বুলেভার্ড থেকে বেশ সকাল সকাল ঋককে সঙ্গে নিয়ে পৌঁছেছি এখানে। স্টু়ডিও শহরে প্রবেশ তোরণের আগে পাহাড়ের মাথায় আছে গাড়ি রাখার জায়গা। সেখানে গাড়ি রেখে— স্টুডিওর ভেতরে এসে উঠেছিলাম এই গাড়িতে। ইউনিভার্সালের নিজস্ব গাড়ি। এগুলোর নাম ‘‘গ্লেমর ট্রাম’’। স্টুডিও শহরে ঢুকতে মাথা পিছু ছ-ডলার লাগে।
প্রতিটি গ্লেমর ট্রামে থাকে তিনটে করে কামরা। একটা কামরায় গিয়ে বসলাম আমরা। ঋক বসল ধারের দিকের আসনে। গাড়ি চলতে শুরু করল, খানিক পরেই ঋক বলে উঠল, ‘‘ছোট কাকু, ওই দেখো বোল্ডার! বোল্ডার!’’
তাকিয়ে দেখি আমাদের গাড়ির ডানদিকে— পাহাড়ের ঢাল বেয়ে অসংখ্য বড় বড় পাথর হুড়মুড় করে গড়িয়ে নামছে। ওর একটা গায়ে এসে পড়লেই গুঁড়িয়ে যাব। ওগুলো দ্রুত গড়িয়ে নামছে ঠিক যেন গা়ড়িতে আছড়ে পড়বে বলেই! পড়লও। তবে পড়ে গাড়ি কিংবা যাত্রীদের কাউকে আহত করল না, ছিটকে গেল। ঋক হাসতে শুরু করল। সত্যি ওই বিশাল বিশাল পাথরের চাঁইগুলো নিজে হাতে তুলে না দেখলে কার সাধ্য বোঝে যে ওগুলো স্পঞ্জের তৈরি। পরে দেখলাম ঋকের চাইতেও অনেক ছোট ছোট ছেলেমেয়ে ফোটো তোলার জন্যে ওগুলো তুলে নিয়ে এটলাসের ভঙ্গিতে পৃথিবী ঘাড়ে করে দাঁড়াচ্ছে।
হঠাৎ দেখি দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে একটা মস্ত দালানে। মুহূর্তে আবার নিভে গেল। বাড়িটা দেখলাম অক্ষতই আছে।
ঋকের কাছে সবচেয়ে বড় জাদু ছিল ‘‘রেড সী’’র জল দুভাগ হয়ে যাওয়া। ওখানে ছশো ফুট লম্বা আর দেড়শো ফুট চওড়া জলাধারটির নাম ‘‘রেড সী’’। আমাদের গ্লেমর ট্রাম তার কাছে যেতেই দেখা গেল নদীর জল মাঝখান থেকে দুভাগ হয়ে যাচ্ছে। আমাদের গাড়ি চলে এল তার ভেতর দিয়ে। আর গাড়ি নদী পেরিয়ে যাবার পরেই ভাগ হয়ে যাওয়া জলের ধারা আবার আগেকার মতো একাকার হয়ে গেল। বৈদ্যুতিক কুহকের এমন মজায় তাজ্জব বনে গিয়ে ঋক তো খানিকটা সময় কোনো কথাই বলতে পারল না।
চমকের পর চমক। একটার ঘোর কাটতে না কাটতেই আর একটা এসে পড়ে। মাঝারিগোছের একটা কাঠের সেতুর ওপর দিয়ে যাচ্ছিল গ্লেমর ট্রাম। নীচে হ্রদ। জানলা দিয়ে আমরা তাকিয়ে ছিলাম নীচের দিকে। আচমকা সেতুর এক পাশের ভারি কাঠামো হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ে গেল নীচের হ্রদে। ধাক্কা সামলে শান্ত হলে দেখা গেল, ভাঙা কাঠামো আবার উঠে গিয়ে জোড়া লেগে যাচ্ছে।
ইউনিভার্সাল স্টুডিওর তোলা বিখ্যাত ছবিগুলোর নানান স্মৃতি ছড়িয়ে আছে এখানে ওখানে। ‘‘দি স্টিং’’, ‘‘অল কোয়ায়েট অন দ্য ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট’’, ‘‘আর্থকোয়েক’’; ‘‘এয়ারপোর্ট ১৯৭৫’’, ‘‘জ’’, ‘‘স্পার্টাকাস’’-এ স্টুডিওর গৌরবের অন্ত নেই। আলফ্রেড হিচককের বিখ্যাত ছবি ‘‘সাইকো’’র বাড়িটাকে দেখাতে ঋক বলল, ‘‘বাড়িটার দিকে তাকালেই কীরকম যেন গা-ছমছম করে ওঠে, তাই না?’’
সারা স্টুডিও-শহর জুড়ে এইসব বড় বড় চমক ছাড়াও ছোটদের আনন্দ দেওয়ার জন্য এত অসংখ্য জিনিস আছে যে, মনে রাখা মুশকিল। পথের মাঝখানে আচমকা বন্যার জল এসে প়ড়া, বজ্রবিদ্যুৎসহ বৃষ্টিপাত কিংবা চোরাবালির মধ্যে আর্তনাদ করতে-করতে স্টুডিওরই কোন কর্মীর ডুবে যাওয়ার মতো দৃশ্য যে কত আছে তার ইয়ত্তা নেই। তবে আর একটা বিস্ময়, ঋক যেটার কথা কখনই ভুলতে পারবে না সেটা হল তুষারাঞ্চলের ঘুরপাক। বাব্বা! কয়েক মিনিট ধরে কী কাণ্ডটাই যে হল!
গ্লেমর ট্রাম উঠে আসছিল ওপর দিকে। অল্প উঠতেই দেখা গেল পাহাড়ের গায়ে লেখা— ২৪,০০০ ফুট উচ্চতা। তারপর গাড়িটা বাঁক নিয়েই একটা বড় সুড়ঙ্গের মধ্যে ঢুকে গেল। সুড়ঙ্গের ঝকঝকে বরফের মতো দেওয়াল ঘুরতে শুরু করে দিল। সেই সঙ্গে হিমবাহের ধস নেমে প্রচণ্ড শব্দ। ভয়ে বুক গুঁড়িয়ে যাবার জোগাড়। যেন হিমবাহের ধসে নেমে যাচ্ছি সবাই।
সকাল থেকে বিকেলের আগে পর্যন্ত এসব দেখেই কাটল। বিকেল থেকে আবার অন্যরকম মজা। হাজার-হাজার দর্শক বসতে পারে এমন এক এম্‌ফিথিয়েটরে বসে দেখা গেল তালিম নেওয়া কুকুর আর কাকাতুয়ার খেলা। দু’জন দর্শককে আমাদের সামনেই সাজান হল মিস্টার আর মিসেস ফ্রাঙ্কেনস্টাইন। অন্য আর এক জায়গায় দর্শকদের নিয়েই একটা অগ্নিকাণ্ডের দৃশ্যের শুটিং তুলে তক্ষুনি সেটা আবার দেখিয়ে দেওয়া হল পর্দায়।

ছবি : অনুপ রায়

তৃতীয় বর্ষ, দ্বাদশ সংখ্যা, চৈত্র ১৩৮৪ (মার্চ, ১৯৭৮)। বানান অপরিবর্তিত রাখা হল।